বাংলাদেশে আবারও আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ হাম, যা ইতোমধ্যেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ বর্তমানে নতুন করে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১২০ অতিক্রম করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ গ্রামাঞ্চলের অনেক রোগী এখনো পরিসংখ্যানের বাইরে রয়ে গেছে।
হামের এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ ডোজ টিকা না পাওয়ায় তারা দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখন রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক হাসপাতালে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছে, ফলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিউমোনিয়া, ডিহাইড্রেশন এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ায় অনেক শিশুকে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে দুই দিনের ব্যবধানে অন্তত চার শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে অভিভাবকদের মধ্যে। চিকিৎসকদের মতে, টিকা না নেওয়া এবং দেরিতে হাসপাতালে আনা, এই দুই কারণেই মৃত্যুহার বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মন্তব্য করেছেন, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি “বজ্রপাতের মতো” আঘাত হেনেছে। তিনি অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় না থাকায় আজকের এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতি কোনো একক সময়ের ব্যর্থতা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়ন দুর্বলতার সম্মিলিত ফল।
বিশ্লেষকদের মতে, হামের এই বিস্তারের মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতি। হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বহু শিশু প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে টিকা নিয়ে গুজব, ভুল ধারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক অভিভাবককে টিকা দিতে নিরুৎসাহিত করেছে। দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও সংক্রমণ বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। অপুষ্টি ও দারিদ্র্য শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিচালিত হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা প্রদান করা হচ্ছে এবং আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও পুনরায় টিকা নিতে পারবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সংক্রমণ বেশি এমন এলাকাগুলোকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু স্বল্পমেয়াদি টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে এই সংকট পুরোপুরি মোকাবিলা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিশুদের জন্য আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং টিকা সংক্রান্ত গুজব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও তদারকি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ১৫ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। ফলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটি বড় ধরনের মহামারীতে রূপ নিতে পারে। সবকিছু বিবেচনায়, বাংলাদেশের বর্তমান হামের পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও প্রস্তুতির একটি কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ আরও বহু প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশে আবারও আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ হাম, যা ইতোমধ্যেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। একসময় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ বর্তমানে নতুন করে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৭ হাজার ছাড়িয়েছে। নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ইতোমধ্যে ১২০ অতিক্রম করেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ গ্রামাঞ্চলের অনেক রোগী এখনো পরিসংখ্যানের বাইরে রয়ে গেছে।
হামের এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সের শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ ডোজ টিকা না পাওয়ায় তারা দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে এখন রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক হাসপাতালে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছে, ফলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিউমোনিয়া, ডিহাইড্রেশন এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো জটিলতা দেখা দেওয়ায় অনেক শিশুকে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগে দুই দিনের ব্যবধানে অন্তত চার শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে অভিভাবকদের মধ্যে। চিকিৎসকদের মতে, টিকা না নেওয়া এবং দেরিতে হাসপাতালে আনা, এই দুই কারণেই মৃত্যুহার বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মন্তব্য করেছেন, দেশে হামের বর্তমান পরিস্থিতি “বজ্রপাতের মতো” আঘাত হেনেছে। তিনি অভিযোগ করেন, মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় না থাকায় আজকের এই সংকট তৈরি হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতি কোনো একক সময়ের ব্যর্থতা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়ন দুর্বলতার সম্মিলিত ফল।
বিশ্লেষকদের মতে, হামের এই বিস্তারের মূল কারণ টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতি। হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বহু শিশু প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে টিকা নিয়ে গুজব, ভুল ধারণা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেক অভিভাবককে টিকা দিতে নিরুৎসাহিত করেছে। দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতাও সংক্রমণ বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। অপুষ্টি ও দারিদ্র্য শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে দেশের ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, যা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিচালিত হচ্ছে। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা প্রদান করা হচ্ছে এবং আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও পুনরায় টিকা নিতে পারবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সংক্রমণ বেশি এমন এলাকাগুলোকে ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু স্বল্পমেয়াদি টিকাদান কর্মসূচি দিয়ে এই সংকট পুরোপুরি মোকাবিলা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, শিশুদের জন্য আইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং টিকা সংক্রান্ত গুজব প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও তদারকি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে ১৫ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হতে পারে। ফলে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটি বড় ধরনের মহামারীতে রূপ নিতে পারে। সবকিছু বিবেচনায়, বাংলাদেশের বর্তমান হামের পরিস্থিতি কেবল একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও প্রস্তুতির একটি কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগ আরও বহু প্রাণ কেড়ে নিতে পারে।
লেখক : মোহাম্মদ আলী সুমন, সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন