জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং ২৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে দিনের বড় অংশজুড়ে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় নগরজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর রাত নামলেই ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, ১৫ এপ্রিল সকাল ও সন্ধ্যার হিসাবে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বেলা ১১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১,৩৮৪ মেগাওয়াট, যা সন্ধ্যা ৭টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৩২ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াটে। বিপরীতে সরবরাহ ছিল সকাল ১১টায় ১,০৯৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১,৪৭০ মেগাওয়াট। এই হিসাবে লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮১ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট।
তবে আরেক হিসাবে দেখা যায়, মোট চাহিদা ১,৩৮৪ দশমিক ৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১,০৯৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়েছে ২৮৮ দশমিক ১৩ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং দেখানো হয়েছে ১১১ দশমিক ৯ মেগাওয়াট।
বন্ধ ছয় কেন্দ্র, উৎপাদনে বড় ঘাটতি
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের ২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ২ (৪৬ মেগাওয়াট), ৩ (৫০ মেগাওয়াট) ও ৫ (৫০ মেগাওয়াট) বন্ধ। এছাড়া রাউজান-১ ও রাউজান-২ (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) এবং জুডিয়াকের ৫৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রও বন্ধ রয়েছে।
সচল কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কাপ্তাই-৪ ইউনিট থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া আনোয়ারা ইউনাইটেড, মিরসরাইয়ের বিআর পাওয়ার, বারাকা গ্রুপের বিভিন্ন কেন্দ্র, দোহাজারী, হাটহাজারী ও এনার্জিপ্যাকসহ একাধিক কেন্দ্র আংশিক উৎপাদনে রয়েছে।
বড় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩২০ মেগাওয়াট, শিকলবাহা কেন্দ্র থেকে ৪২৭ মেগাওয়াট এবং বাঁশখালীর এস আলম বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৯০২ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে।
নগরজীবনে নাভিশ্বাস
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা ফিরতে সময় লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা, যা রাতে আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি সংরক্ষণে সমস্যা হওয়ায় অনেকেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।
জ্বালানি সংকটই মূল কারণ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত গরম বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। তবে চলমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম পিডিবির সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ফাহমিদা জামান বলেন, গ্যাসের চাপ কম এবং জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে।
তিনি জানান, সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ওঠানামা করছে। পরিস্থিতির উন্নতি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সামনে আরও খারাপ সময়?
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার অফিস সময় কমানো ও শপিং মল দ্রুত বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং ২৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে দিনের বড় অংশজুড়ে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় নগরজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর রাত নামলেই ভোগান্তি কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, ১৫ এপ্রিল সকাল ও সন্ধ্যার হিসাবে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বেলা ১১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১,৩৮৪ মেগাওয়াট, যা সন্ধ্যা ৭টায় বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৩২ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াটে। বিপরীতে সরবরাহ ছিল সকাল ১১টায় ১,০৯৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১,৪৭০ মেগাওয়াট। এই হিসাবে লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮১ দশমিক ৮২ মেগাওয়াট।
তবে আরেক হিসাবে দেখা যায়, মোট চাহিদা ১,৩৮৪ দশমিক ৯ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১,০৯৫ দশমিক ৯৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়েছে ২৮৮ দশমিক ১৩ মেগাওয়াট এবং লোডশেডিং দেখানো হয়েছে ১১১ দশমিক ৯ মেগাওয়াট।
বন্ধ ছয় কেন্দ্র, উৎপাদনে বড় ঘাটতি
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের ২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে জ্বালানি সংকটের কারণে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ২ (৪৬ মেগাওয়াট), ৩ (৫০ মেগাওয়াট) ও ৫ (৫০ মেগাওয়াট) বন্ধ। এছাড়া রাউজান-১ ও রাউজান-২ (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট) এবং জুডিয়াকের ৫৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রও বন্ধ রয়েছে।
সচল কেন্দ্রগুলোর মধ্যে কাপ্তাই-৪ ইউনিট থেকে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া আনোয়ারা ইউনাইটেড, মিরসরাইয়ের বিআর পাওয়ার, বারাকা গ্রুপের বিভিন্ন কেন্দ্র, দোহাজারী, হাটহাজারী ও এনার্জিপ্যাকসহ একাধিক কেন্দ্র আংশিক উৎপাদনে রয়েছে।
বড় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩২০ মেগাওয়াট, শিকলবাহা কেন্দ্র থেকে ৪২৭ মেগাওয়াট এবং বাঁশখালীর এস আলম বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৯০২ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়েছে।
নগরজীবনে নাভিশ্বাস
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে নগরীর চকবাজার, বহদ্দারহাট, পাঁচলাইশ, আগ্রাবাদ, হালিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তা ফিরতে সময় লাগছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা, যা রাতে আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।
ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। ওয়াসার পানি সংরক্ষণে সমস্যা হওয়ায় অনেকেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ঝুঁকি বেড়ে গেছে।
জ্বালানি সংকটই মূল কারণ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত গরম বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। তবে চলমান জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম পিডিবির সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইজিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ফাহমিদা জামান বলেন, গ্যাসের চাপ কম এবং জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোডশেডিং বাড়ছে।
তিনি জানান, সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ওঠানামা করছে। পরিস্থিতির উন্নতি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সামনে আরও খারাপ সময়?
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার অফিস সময় কমানো ও শপিং মল দ্রুত বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট ও লোডশেডিং আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন