মুক্তির লড়াই

মতামত

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অভিযাত্রা: বহুপাক্ষিক কূটনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অভিযাত্রা: বহুপাক্ষিক কূটনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। সাইপ্রাসের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৯৯-৯১ ভোটের এই ব্যবধান প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে। তবে এই বিজয়কে কেবল একটি কাঠামোগত অর্জন হিসেবে না দেখে, এর নেপথ্যের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং গভীর আন্তর্জাতিক সমীকরণকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।এই কূটনৈতিক সাফল্যের বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে। 

ডক্টর ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ক্ষমতার স্বাভাবিক পরিক্রমায় বর্তমান বিএনপি সরকার এসে সেই কূটনৈতিক সম্ভাবনাকে অত্যন্ত পরিপক্ক রাষ্ট্রনায়কোচিত অবয়বে ধারণ করেছে এবং একে আরও গতিশীল করেছে। ক্ষমতার পরিবর্তন সত্ত্বেও বৈদেশিক নীতির এই ধারাবাহিকতা দেশের রাজনৈতিক পরিপক্কতারই ইঙ্গিত দেয়। তবে এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নবনির্বাচিত সভাপতির সামনে সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা হবে—তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও নীতিগত অবস্থানে ‘জনতার জুলাইয়ের’ সেই অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে।ড. খলিলুর রহমান কেবল একজন ঝানু কূটনীতিকই নন, তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে পলিসি মেকিংয়ে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে অতীতে নীতিনির্ধারক হিসেবে থাকার পরও রোহিঙ্গা সংকটের কোনো স্থায়ী বা দৃশ্যমান দ্বিপাক্ষিক সমাধান তিনি টানতে পারেননি—এই ঐতিহাসিক সমালোচনাকে এড়ানোর সুযোগ নেই। এখন সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে মিয়ানমারের ওপর বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তার তহবিল সংকটের সমাধান করা তাঁর আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সামনে এক বড় পরীক্ষা। 

একই সাথে, জুলাইয়ের গণহত্যার খলনায়কদের জবাবদিহিতা ও বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তা তাঁর আইনি দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করছে।বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হলো প্রতিবেশী ভারতের ‘হাইড্রো-হেজেমনি’ বা অভিন্ন নদীর পানি বন্টনে একতরফা আধিপত্যবাদ। তাই ভারত তার ভোট খলিলুর রহমানের বিপরীতেই দিয়েছে। 

আন্তর্জাতিক জলবায়ু আইন ও ভাটির দেশের অধিকারকে উপেক্ষা করে নদী-নিয়ন্ত্রণের যে নীতি ভারত বজায় রেখেছে, তা এখন আর কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয় নয়। ড. খলিলুর রহমান তাঁর মেয়াদে ‘জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা’-কে অন্যতম মূল অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আইন অনুসরণ করে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য অধিকারের বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা তাঁর অন্যতম ঐতিহাসিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। ১ বছরের এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্ব কেবল জাতিসংঘের কার্যকারিতা সংস্কারের পরীক্ষা নয়, বরং এটি একটি সংস্কারকামী বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ। পুরো বাঙ্গালী জাতি সহ  জুলাই  এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ হতে খলিলুর রহমান কে অভিন্দন ও দীর্ঘ আয়ু কামনা করে সফলতা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম বাংলা ভাষাভাষি জনতা ।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অভিযাত্রা: বহুপাক্ষিক কূটনীতির চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। সাইপ্রাসের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ৯৯-৯১ ভোটের এই ব্যবধান প্রমাণ করে যে, বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রয়েছে। তবে এই বিজয়কে কেবল একটি কাঠামোগত অর্জন হিসেবে না দেখে, এর নেপথ্যের রাজনৈতিক রূপান্তর এবং গভীর আন্তর্জাতিক সমীকরণকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।এই কূটনৈতিক সাফল্যের বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল নোবেলজয়ী ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে। 


ডক্টর ইউনূসের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল, তা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। ক্ষমতার স্বাভাবিক পরিক্রমায় বর্তমান বিএনপি সরকার এসে সেই কূটনৈতিক সম্ভাবনাকে অত্যন্ত পরিপক্ক রাষ্ট্রনায়কোচিত অবয়বে ধারণ করেছে এবং একে আরও গতিশীল করেছে। ক্ষমতার পরিবর্তন সত্ত্বেও বৈদেশিক নীতির এই ধারাবাহিকতা দেশের রাজনৈতিক পরিপক্কতারই ইঙ্গিত দেয়। তবে এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নবনির্বাচিত সভাপতির সামনে সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা হবে—তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও নীতিগত অবস্থানে ‘জনতার জুলাইয়ের’ সেই অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে।ড. খলিলুর রহমান কেবল একজন ঝানু কূটনীতিকই নন, তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে পলিসি মেকিংয়ে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তবে অতীতে নীতিনির্ধারক হিসেবে থাকার পরও রোহিঙ্গা সংকটের কোনো স্থায়ী বা দৃশ্যমান দ্বিপাক্ষিক সমাধান তিনি টানতে পারেননি—এই ঐতিহাসিক সমালোচনাকে এড়ানোর সুযোগ নেই। এখন সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে মিয়ানমারের ওপর বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তার তহবিল সংকটের সমাধান করা তাঁর আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সামনে এক বড় পরীক্ষা। 

একই সাথে, জুলাইয়ের গণহত্যার খলনায়কদের জবাবদিহিতা ও বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তা তাঁর আইনি দূরদর্শিতার ওপর নির্ভর করছে।বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য আরেকটি বড় হুমকি হলো প্রতিবেশী ভারতের ‘হাইড্রো-হেজেমনি’ বা অভিন্ন নদীর পানি বন্টনে একতরফা আধিপত্যবাদ। তাই ভারত তার ভোট খলিলুর রহমানের বিপরীতেই দিয়েছে। 


আন্তর্জাতিক জলবায়ু আইন ও ভাটির দেশের অধিকারকে উপেক্ষা করে নদী-নিয়ন্ত্রণের যে নীতি ভারত বজায় রেখেছে, তা এখন আর কেবল দ্বিপাক্ষিক আলোচনার বিষয় নয়। ড. খলিলুর রহমান তাঁর মেয়াদে ‘জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা’-কে অন্যতম মূল অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং, আন্তর্জাতিক জলবায়ু আইন অনুসরণ করে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য অধিকারের বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এজেন্ডা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা তাঁর অন্যতম ঐতিহাসিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। ১ বছরের এই সংক্ষিপ্ত মেয়াদে ড. খলিলুর রহমানের নেতৃত্ব কেবল জাতিসংঘের কার্যকারিতা সংস্কারের পরীক্ষা নয়, বরং এটি একটি সংস্কারকামী বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্ব দরবারে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ। পুরো বাঙ্গালী জাতি সহ  জুলাই  এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ হতে খলিলুর রহমান কে অভিন্দন ও দীর্ঘ আয়ু কামনা করে সফলতা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম বাংলা ভাষাভাষি জনতা ।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই