মুক্তির লড়াই

মতামত

অপ্রতিমের রক্তে লেখা প্রশ্ন: আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ছি?

অপ্রতিমের রক্তে লেখা প্রশ্ন: আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ছি?

শুক্রবারের সেই বিকেলটা হয়তো কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় সাধারণই কেটে যেত। একজন মা তার একমাত্র সন্তানকে আদর করে বিদায় জানাতেন, একজন বাবা হয়তো দোকান থেকে ফিরে ছেলের মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকতেন। কিন্তু সেই বিকেলটা আর সাধারণ থাকল না। ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বেরিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে। তার চোখে ছিল কৌতূহল, মুখে ছিল হাসি, হৃদয়ে ছিল নিষ্পাপ আনন্দ। সে জানত না, সেই ছোট্ট যাত্রাই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে যাবে। লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে বাঁশের লাঠির নির্মম আঘাতে তার ছোট্ট মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর সেই আইফোনটুকুই হবে তার প্রাণের মূল্য।

আজ যখন আমি এই সম্পাদকীয় লিখছি, তখন অপ্রতিমের দেহ ইতিমধ্যেই মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত। দুই দফা জানাজা শেষে কোটবাড়ির বাগমারা গোরস্থানে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা ড. নাহিদা বেগম-কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক-তিনি আজ শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন শোকাহত মা। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ও কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন পিতা, যার বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে গেছে। তাদের একমাত্র সন্তান চলে গেছে। যে সন্তানকে নিয়ে তারা স্বপ্ন দেখতেন, যে সন্তানের হাসিতে তাদের ঘর আলো হয়ে উঠত, সেই সন্তান আজ নেই। শুধু একটি আইফোনের লোভে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সত্য। শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার সঙ্গে ছিল সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক ফাহাদ ও কামরুল। তারা অপ্রতিমের সহপাঠী ছিল না। অসমবয়সি ‘বন্ধুত্ব’র আড়ালে লুকিয়ে ছিল নির্মম লোভ। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় যখন অপ্রতিম বাধা দেয়, তখন শুরু হয় ধস্তাধস্তি। প্রথমে তুহিন লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। তারপর ফাহাদ ও কামরুলও একইভাবে আঘাত হানে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়ে। পরদিন সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে মাকে সান্ত্বনাও দেয়-যেন কিছুই হয়নি। এই নির্লজ্জতা আমাদের সমাজের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দ্রুত তুহিনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে অপরাধ স্বীকার করে। পরে অন্যদেরও গ্রেফতার করা হয়। আইফোনও উদ্ধার হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশংসা করেছেন পুলিশের তৎপরতার। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছে, ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছে। এসবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু গ্রেফতার আর বিক্ষোভ দিয়ে কি এই ক্ষত সারবে? অপ্রতিমের রক্ত কি শুধু একটি মামলার ফাইলে বন্দি হয়ে থাকবে?

এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে তিনটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। প্রথম প্রশ্ন-আমাদের কিশোর-তরুণ সমাজ কোথায় যাচ্ছে? তুহিন, ফাহাদ, কামরুল-এরা কেউই অপ্রতিমের সহপাঠী ছিল না। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া বা অনিয়মিত শিক্ষার্থী। তাদের জীবনে শিক্ষার অভাব, মূল্যবোধের শূন্যতা, আর সহজে টাকার লোভ মিলেমিশে এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। একটি আইফোনের জন্য একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া-এটা শুধু অপরাধ নয়, মানবতার প্রতি চরম অবমাননা। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ডিগ্রি দিতে ব্যস্ত, নাকি তাদের মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, স্কুলে মূল্যবোধ চর্চার দুর্বলতা, আর সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি-এই ত্রিমুখী ব্যর্থতাই আজ অপ্রতিমের মতো শিশুদের কবর দিচ্ছে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন-আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল যেন অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। একটি শিশু বিকেল বেলা বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসছে না-এই বাস্তবতা আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির করুণ চিত্র তুলে ধরে। সিসিটিভি থাকলেও, পুলিশ থাকলেও, শিশুরা নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ইউনিট, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর হেল্পলাইন-এসব দাবি এখন আর উপেক্ষা করা যায় না। শিক্ষার্থীরা যে চার দফা দাবি তুলেছে, তা শুধু তাদের দাবি নয়-গোটা জাতির দাবি।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন-আমরা কী ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে আছি? একটি আইফোন। এক টুকরো ধাতব যন্ত্র। আর তার বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন। এই সমীকরণ কি আমাদের সমাজের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে? আমরা কি এতটাই লোভী হয়ে গেছি যে একটি শিশুর প্রাণের চেয়ে একটি ফোন বেশি মূল্যবান? অপ্রতিমের মা ফেসবুকে ছেলেকে খুঁজে পেতে সাহায্য চেয়েছিলেন। তার সেই আকুতি আজও আমাদের কানে বাজে। কিন্তু আমরা কি শুনেছি? নাকি শুধু খবর পড়ে পরের খবরে চলে গেছি?

অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড শুধু কুমিল্লার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, প্রতিটি গ্রামের সম্ভাব্য বাস্তবতা। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে, হত্যা হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে। আমরা খবর পড়ি, কিছুক্ষণ আলোচনা করি, তারপর ভুলে যাই। কিন্তু অপ্রতিমের মা ভুলতে পারবেন না। তার বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন ভরবে না। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার যে স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে নিয়ে, সেই স্বপ্ন আজ ছাই হয়ে গেছে। তারা আজ শুধু একটি সন্তান হারাননি-তারা হারিয়েছেন ভবিষ্যতের সব আলো।

এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার। আসামিদের শাস্তি যেন উদাহরণ হয়। কেউ যেন আর ভাবে না যে একটি শিশুর জীবন এত সস্তা। দ্বিতীয়ত, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ। পরিবারে সচেতনতা, স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, আর সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ চর্চা-এগুলো অপরিহার্য। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দৃশ্যমান পুলিশ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো রেজাল্টের পেছনে ছুটতে শেখাচ্ছি, নাকি তাদের মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? আমরা কি লোভকে জয় করার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি লোভকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে তুলছি?

অপ্রতিম চলে গেছে। কিন্তু তার রক্তে লেখা প্রশ্নটি রয়ে গেছে। আমরা কি এই সমাজকে বদলাতে পারব? নাকি আরও অনেক মায়ের কান্না শুনতে শুনতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠব? উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। আজই। কাল হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। কারণ অপ্রতিমের মতো আরও অনেক শিশু আজও বাইরে খেলছে, ছবি তুলছে, স্বপ্ন দেখছে। তাদের নিরাপত্তা আমাদের দায়িত্ব। তাদের হাসি আমাদের সম্পদ। আর তাদের জীবন-কোনো আইফোনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

আমরা যদি আজ নীরব থাকি, যদি শুধু খবর পড়েই ক্ষান্ত দিই, তবে অপ্রতিমের রক্ত বৃথা যাবে। কিন্তু আমরা যদি জেগে উঠি, যদি পরিবর্তনের শপথ নিই, তবে তার ছোট্ট জীবন হয়তো অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। মা নাহিদা বেগম আজ হয়তো শুধু কান্নাই করতে পারেন। বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার হয়তো শুধু নীরব যন্ত্রণাই বহন করতে পারেন। কিন্তু আমরা-সমাজের মানুষরা-পারি আরও কিছু। আমরা পারি প্রতিজ্ঞা করতে যে আর কোনো অপ্রতিম যেন এভাবে না হারায়। আর কোনো মা যেন এভাবে না কাঁদে। আর কোনো আইফোন যেন আর কোনো শিশুর প্রাণের মূল্য না হয়।

আমার লেখা এই সম্পাদকীয় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়। এটি একটি আহ্বান। একটি শপথ। একটি প্রতিজ্ঞা। অপ্রতিমের স্মৃতিকে আমরা যদি শুধু কান্নায় সীমাবদ্ধ রাখি, তবে আমরা ব্যর্থ। কিন্তু যদি তার রক্তকে পরিবর্তনের শক্তি বানাই, তবে হয়তো একদিন আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারব যেখানে একটি শিশুর হাসি কোনো লোভের শিকার হবে না। যেখানে একটি মায়ের আইফোন কোনো হত্যার কারণ হবে না। যেখানে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল আর কোনো শিশুর কবরস্থান হবে না।

অপ্রতিম, তুমি চলে গেছ। কিন্তু তোমার প্রশ্নটি রয়ে গেছে। আমরা উত্তর দেব-আজই।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক। 

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অপ্রতিমের রক্তে লেখা প্রশ্ন: আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ছি?

প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

শুক্রবারের সেই বিকেলটা হয়তো কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় সাধারণই কেটে যেত। একজন মা তার একমাত্র সন্তানকে আদর করে বিদায় জানাতেন, একজন বাবা হয়তো দোকান থেকে ফিরে ছেলের মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকতেন। কিন্তু সেই বিকেলটা আর সাধারণ থাকল না। ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বেরিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে। তার চোখে ছিল কৌতূহল, মুখে ছিল হাসি, হৃদয়ে ছিল নিষ্পাপ আনন্দ। সে জানত না, সেই ছোট্ট যাত্রাই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে যাবে। লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে বাঁশের লাঠির নির্মম আঘাতে তার ছোট্ট মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর সেই আইফোনটুকুই হবে তার প্রাণের মূল্য।

আজ যখন আমি এই সম্পাদকীয় লিখছি, তখন অপ্রতিমের দেহ ইতিমধ্যেই মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত। দুই দফা জানাজা শেষে কোটবাড়ির বাগমারা গোরস্থানে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা ড. নাহিদা বেগম-কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক-তিনি আজ শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন শোকাহত মা। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ও কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন পিতা, যার বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে গেছে। তাদের একমাত্র সন্তান চলে গেছে। যে সন্তানকে নিয়ে তারা স্বপ্ন দেখতেন, যে সন্তানের হাসিতে তাদের ঘর আলো হয়ে উঠত, সেই সন্তান আজ নেই। শুধু একটি আইফোনের লোভে।

পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সত্য। শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার সঙ্গে ছিল সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক ফাহাদ ও কামরুল। তারা অপ্রতিমের সহপাঠী ছিল না। অসমবয়সি ‘বন্ধুত্ব’র আড়ালে লুকিয়ে ছিল নির্মম লোভ। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় যখন অপ্রতিম বাধা দেয়, তখন শুরু হয় ধস্তাধস্তি। প্রথমে তুহিন লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। তারপর ফাহাদ ও কামরুলও একইভাবে আঘাত হানে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়ে। পরদিন সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে মাকে সান্ত্বনাও দেয়-যেন কিছুই হয়নি। এই নির্লজ্জতা আমাদের সমাজের মুখোশ খুলে দিয়েছে।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দ্রুত তুহিনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে অপরাধ স্বীকার করে। পরে অন্যদেরও গ্রেফতার করা হয়। আইফোনও উদ্ধার হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশংসা করেছেন পুলিশের তৎপরতার। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছে, ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছে। এসবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু গ্রেফতার আর বিক্ষোভ দিয়ে কি এই ক্ষত সারবে? অপ্রতিমের রক্ত কি শুধু একটি মামলার ফাইলে বন্দি হয়ে থাকবে?

এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে তিনটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। প্রথম প্রশ্ন-আমাদের কিশোর-তরুণ সমাজ কোথায় যাচ্ছে? তুহিন, ফাহাদ, কামরুল-এরা কেউই অপ্রতিমের সহপাঠী ছিল না। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া বা অনিয়মিত শিক্ষার্থী। তাদের জীবনে শিক্ষার অভাব, মূল্যবোধের শূন্যতা, আর সহজে টাকার লোভ মিলেমিশে এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। একটি আইফোনের জন্য একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া-এটা শুধু অপরাধ নয়, মানবতার প্রতি চরম অবমাননা। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ডিগ্রি দিতে ব্যস্ত, নাকি তাদের মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, স্কুলে মূল্যবোধ চর্চার দুর্বলতা, আর সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি-এই ত্রিমুখী ব্যর্থতাই আজ অপ্রতিমের মতো শিশুদের কবর দিচ্ছে।

দ্বিতীয় প্রশ্ন-আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল যেন অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। একটি শিশু বিকেল বেলা বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসছে না-এই বাস্তবতা আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির করুণ চিত্র তুলে ধরে। সিসিটিভি থাকলেও, পুলিশ থাকলেও, শিশুরা নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ইউনিট, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর হেল্পলাইন-এসব দাবি এখন আর উপেক্ষা করা যায় না। শিক্ষার্থীরা যে চার দফা দাবি তুলেছে, তা শুধু তাদের দাবি নয়-গোটা জাতির দাবি।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন-আমরা কী ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে আছি? একটি আইফোন। এক টুকরো ধাতব যন্ত্র। আর তার বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন। এই সমীকরণ কি আমাদের সমাজের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে? আমরা কি এতটাই লোভী হয়ে গেছি যে একটি শিশুর প্রাণের চেয়ে একটি ফোন বেশি মূল্যবান? অপ্রতিমের মা ফেসবুকে ছেলেকে খুঁজে পেতে সাহায্য চেয়েছিলেন। তার সেই আকুতি আজও আমাদের কানে বাজে। কিন্তু আমরা কি শুনেছি? নাকি শুধু খবর পড়ে পরের খবরে চলে গেছি?

অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড শুধু কুমিল্লার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, প্রতিটি গ্রামের সম্ভাব্য বাস্তবতা। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে, হত্যা হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে। আমরা খবর পড়ি, কিছুক্ষণ আলোচনা করি, তারপর ভুলে যাই। কিন্তু অপ্রতিমের মা ভুলতে পারবেন না। তার বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন ভরবে না। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার যে স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে নিয়ে, সেই স্বপ্ন আজ ছাই হয়ে গেছে। তারা আজ শুধু একটি সন্তান হারাননি-তারা হারিয়েছেন ভবিষ্যতের সব আলো।

এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার। আসামিদের শাস্তি যেন উদাহরণ হয়। কেউ যেন আর ভাবে না যে একটি শিশুর জীবন এত সস্তা। দ্বিতীয়ত, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ। পরিবারে সচেতনতা, স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, আর সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ চর্চা-এগুলো অপরিহার্য। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দৃশ্যমান পুলিশ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো রেজাল্টের পেছনে ছুটতে শেখাচ্ছি, নাকি তাদের মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? আমরা কি লোভকে জয় করার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি লোভকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে তুলছি?

অপ্রতিম চলে গেছে। কিন্তু তার রক্তে লেখা প্রশ্নটি রয়ে গেছে। আমরা কি এই সমাজকে বদলাতে পারব? নাকি আরও অনেক মায়ের কান্না শুনতে শুনতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠব? উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। আজই। কাল হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। কারণ অপ্রতিমের মতো আরও অনেক শিশু আজও বাইরে খেলছে, ছবি তুলছে, স্বপ্ন দেখছে। তাদের নিরাপত্তা আমাদের দায়িত্ব। তাদের হাসি আমাদের সম্পদ। আর তাদের জীবন-কোনো আইফোনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।

আমরা যদি আজ নীরব থাকি, যদি শুধু খবর পড়েই ক্ষান্ত দিই, তবে অপ্রতিমের রক্ত বৃথা যাবে। কিন্তু আমরা যদি জেগে উঠি, যদি পরিবর্তনের শপথ নিই, তবে তার ছোট্ট জীবন হয়তো অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। মা নাহিদা বেগম আজ হয়তো শুধু কান্নাই করতে পারেন। বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার হয়তো শুধু নীরব যন্ত্রণাই বহন করতে পারেন। কিন্তু আমরা-সমাজের মানুষরা-পারি আরও কিছু। আমরা পারি প্রতিজ্ঞা করতে যে আর কোনো অপ্রতিম যেন এভাবে না হারায়। আর কোনো মা যেন এভাবে না কাঁদে। আর কোনো আইফোন যেন আর কোনো শিশুর প্রাণের মূল্য না হয়।

আমার লেখা এই সম্পাদকীয় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়। এটি একটি আহ্বান। একটি শপথ। একটি প্রতিজ্ঞা। অপ্রতিমের স্মৃতিকে আমরা যদি শুধু কান্নায় সীমাবদ্ধ রাখি, তবে আমরা ব্যর্থ। কিন্তু যদি তার রক্তকে পরিবর্তনের শক্তি বানাই, তবে হয়তো একদিন আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারব যেখানে একটি শিশুর হাসি কোনো লোভের শিকার হবে না। যেখানে একটি মায়ের আইফোন কোনো হত্যার কারণ হবে না। যেখানে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল আর কোনো শিশুর কবরস্থান হবে না।

অপ্রতিম, তুমি চলে গেছ। কিন্তু তোমার প্রশ্নটি রয়ে গেছে। আমরা উত্তর দেব-আজই।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক। 


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই