ঢাকা   বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
মুক্তির লড়াই

১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস রেলে শোষণ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট: ক্যান্টিনে দুর্নীতির ছায়া



১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস রেলে শোষণ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট: ক্যান্টিনে দুর্নীতির ছায়া
নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলাদেশ রেলওয়ের জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন “১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস” ও “কালনী এক্সপ্রেস”-এর ক্যান্টিন সেবা, খাদ্য সরবরাহ, ও পরিষেবা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে চলছে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক শোষণ ও দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সুরুচি ফাস্ট ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড এবং ভুটান বেভারেজ লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুর রাজ্জাক – যিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়ায় রেল মন্ত্রণালয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। একচেটিয়া ঠিকাদারি ও টেন্ডার কারসাজি অভিযোগ রয়েছে, একই ঠিকাদার তার দুটি কোম্পানির মাধ্যমে একাধিক ট্রেনের খাবার সরবরাহ চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করেন। ১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস ও কালনী এক্সপ্রেস – উভয় ট্রেনেই তার প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তিবদ্ধ। অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, একাধিক কোম্পানি এক মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা ব্যবহার করে দরপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা ব্যাহত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে তিনি এই চুক্তি হাতিয়ে নেন। শ্রমিক শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন খাবার পরিবেশন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পানি সরবরাহের কাজে নিযুক্ত প্রায় ৬৫ জন শ্রমিকের মধ্যে অধিকাংশেরই নেই কোনো নিয়োগপত্র, বেতন বা স্বাস্থ্যসুরক্ষা। যারা বেতন পান তাদের ১২ হাজার টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর জোর করে কোম্পানির কাছে ফেরত দিতে হয়। আরও ভয়াবহ অভিযোগ – চাকরি পেতে হলে দিতে হয় ১ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা। প্রতি মাসে ৭-৮ জনকে ছাঁটাই করা হয়, কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হয় না। সাবেক শ্রমিকদের সাক্ষ্যঃ মোঃ আরিফুল ইসলাম (বরিশাল): “১৭ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ মাস কাজ করার পর সামান্য ভুলে ছাঁটাই। এক টাকাও পাইনি।" মোঃ রফিকুল ইসলাম (বরগুনা): “২ লক্ষ টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছিলাম, ৯ মাসে এক টাকাও বেতন পাইনি।" মোঃ কামরুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ): “এই ট্রেনের মূল ব্যবসা নারী ব্যবসা আর শ্রমিকদের দিয়ে অর্থ আদায়।" অবৈধ আয় ও যাত্রী হয়রানি বিনা টিকিটে যাত্রী উঠিয়ে অতিরিক্ত চেয়ারে বসিয়ে অর্থ আদায়, খাবার বিক্রিতে জোরপূর্বক কমিশন আদায় – এসবই যেন রোজকার ঘটনা। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের – বাসি, দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, দূষিত পানি; অথচ দাম ৩০-৫০ টাকার জায়গায় ১০০ টাকা বা তারও বেশি। যাত্রী অভিজ্ঞতা: নাজমুল হাসান নামে এক যাত্রী বলেন, “১৬০ টাকা দিয়ে এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়েছিলাম। খাওয়া যাচ্ছিল না। ফেরত দিতে চাইলে বাজে ব্যবহার করা হয়।" রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে ওবায়দুল কাদেরের আত্মীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ। পরে আবার বিএনপির নেতার নাম ভাঙিয়ে কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনেরও চুক্তি নেন। একাধিক রেল কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে অভিযোগ জমা পড়লেও "উপরে থেকে চাপ আসে", ফলে তদন্ত থেমে যায়। উপসংহার বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনভিত্তিক ক্যান্টিন ও খাদ্যসেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। এখানে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও দুর্নীতির বন্ধনেই গলা টিপে ধরা হচ্ছে শ্রমিকদের, হয়রানি করা হচ্ছে যাত্রীদের। প্রশ্ন রইল: রেলপথ মন্ত্রণালয় কি এসব অভিযোগ আমলে নেবে? কবে বন্ধ হবে ট্রেনকেন্দ্রিক শ্রমিক শোষণ ও ঠিকাদারি দুর্নীতির এই বৃত্ত?

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬


১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস রেলে শোষণ ও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট: ক্যান্টিনে দুর্নীতির ছায়া

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৫

featured Image
নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলাদেশ রেলওয়ের জনপ্রিয় আন্তঃনগর ট্রেন “১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস” ও “কালনী এক্সপ্রেস”-এর ক্যান্টিন সেবা, খাদ্য সরবরাহ, ও পরিষেবা কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে চলছে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিক শোষণ ও দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন সুরুচি ফাস্ট ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড এবং ভুটান বেভারেজ লিমিটেড নামের দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আব্দুর রাজ্জাক – যিনি রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়ায় রেল মন্ত্রণালয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। একচেটিয়া ঠিকাদারি ও টেন্ডার কারসাজি অভিযোগ রয়েছে, একই ঠিকাদার তার দুটি কোম্পানির মাধ্যমে একাধিক ট্রেনের খাবার সরবরাহ চুক্তি নিয়ন্ত্রণ করেন। ১১ সিন্দূর এক্সপ্রেস ও কালনী এক্সপ্রেস – উভয় ট্রেনেই তার প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তিবদ্ধ। অভ্যন্তরীণ নথিপত্র অনুযায়ী, একাধিক কোম্পানি এক মোবাইল নম্বর ও ঠিকানা ব্যবহার করে দরপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা ব্যাহত করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে তিনি এই চুক্তি হাতিয়ে নেন। শ্রমিক শোষণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন খাবার পরিবেশন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পানি সরবরাহের কাজে নিযুক্ত প্রায় ৬৫ জন শ্রমিকের মধ্যে অধিকাংশেরই নেই কোনো নিয়োগপত্র, বেতন বা স্বাস্থ্যসুরক্ষা। যারা বেতন পান তাদের ১২ হাজার টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনের পর জোর করে কোম্পানির কাছে ফেরত দিতে হয়। আরও ভয়াবহ অভিযোগ – চাকরি পেতে হলে দিতে হয় ১ থেকে ২.৫ লক্ষ টাকা। প্রতি মাসে ৭-৮ জনকে ছাঁটাই করা হয়, কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া হয় না। সাবেক শ্রমিকদের সাক্ষ্যঃ মোঃ আরিফুল ইসলাম (বরিশাল): “১৭ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ মাস কাজ করার পর সামান্য ভুলে ছাঁটাই। এক টাকাও পাইনি।" মোঃ রফিকুল ইসলাম (বরগুনা): “২ লক্ষ টাকা দিয়ে চাকরি নিয়েছিলাম, ৯ মাসে এক টাকাও বেতন পাইনি।" মোঃ কামরুল ইসলাম (কিশোরগঞ্জ): “এই ট্রেনের মূল ব্যবসা নারী ব্যবসা আর শ্রমিকদের দিয়ে অর্থ আদায়।" অবৈধ আয় ও যাত্রী হয়রানি বিনা টিকিটে যাত্রী উঠিয়ে অতিরিক্ত চেয়ারে বসিয়ে অর্থ আদায়, খাবার বিক্রিতে জোরপূর্বক কমিশন আদায় – এসবই যেন রোজকার ঘটনা। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের – বাসি, দুর্গন্ধযুক্ত খাবার, দূষিত পানি; অথচ দাম ৩০-৫০ টাকার জায়গায় ১০০ টাকা বা তারও বেশি। যাত্রী অভিজ্ঞতা: নাজমুল হাসান নামে এক যাত্রী বলেন, “১৬০ টাকা দিয়ে এক প্লেট বিরিয়ানি নিয়েছিলাম। খাওয়া যাচ্ছিল না। ফেরত দিতে চাইলে বাজে ব্যবহার করা হয়।" রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা আব্দুর রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে ওবায়দুল কাদেরের আত্মীয় পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন বলে অভিযোগ। পরে আবার বিএনপির নেতার নাম ভাঙিয়ে কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনেরও চুক্তি নেন। একাধিক রেল কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে অভিযোগ জমা পড়লেও "উপরে থেকে চাপ আসে", ফলে তদন্ত থেমে যায়। উপসংহার বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেনভিত্তিক ক্যান্টিন ও খাদ্যসেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। এখানে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও দুর্নীতির বন্ধনেই গলা টিপে ধরা হচ্ছে শ্রমিকদের, হয়রানি করা হচ্ছে যাত্রীদের। প্রশ্ন রইল: রেলপথ মন্ত্রণালয় কি এসব অভিযোগ আমলে নেবে? কবে বন্ধ হবে ট্রেনকেন্দ্রিক শ্রমিক শোষণ ও ঠিকাদারি দুর্নীতির এই বৃত্ত?

মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ মুক্তির লড়াই । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত