১৯৬৬ সালের ৭ জুন বাঙালির ইতিহাসে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর দিন নয়, এটি ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কৃত্রিম ও অন্যায্য কাঠামোর ভেতরে শোষিত এক জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। আজ সেই ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। ৬০ বছর আগের এই দিনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কেঁপে উঠেছিল স্বাধিকারের তীব্র দাবিতে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পদ্ধতিগত শোষণ, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো কিংবদন্তি নেতারা আজীবন লড়াই করেছেন। তবে ষাটের দশকে এসে সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে একটি সুনির্দিষ্ট, কাঠামোগত এবং আপসহীন রূপ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে তিনি উত্থাপন করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি, যা দ্রুতই রূপ নেয় বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক মুক্তির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির সনদে। এই কর্মসূচির মূল দর্শনটাই ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার-পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সম্পদ, রাজনীতি আর নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এ অঞ্চলের মানুষের হাতেই। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয়, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালে। সেই দিন স্বাধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসা হাজারো মানুষের ওপর টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তৎকালীন পুলিশ ও ইপিআর নির্বিচারে গুলি চালালে মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকসহ ১১ জন বীর বাঙালি শহীদ হন। এই রক্তের দাগই পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের চরিত্রকে চিরতরে ড্রয়িংরুমের রাজনীতি থেকে বের করে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও সাধারণ পেশাজীবীদের গণ-আন্দোলনে পরিণত করে এবং বাঙালি জাতিকে আপসহীন সংগ্রামের ধারায় ধাবিত করে।
ইতিহাসের আলোকে এই ছয় দফার প্রতিটি দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত পাকিস্তানের সংবিধানের ভেতরে থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার এক চরম গণতান্ত্রিক লড়াই।
কর্মসূচির প্রথম দফায় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়, যেখানে সরকার হবে সংসদীয় পদ্ধতির এবং আইনসভা নির্বাচিত হবে প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে; যা মূলত আইয়ুব খানের 'বেসিক ডেমোক্রেসি' বা নিয়ন্ত্রিত একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার মূল উৎস জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক চাবিকাঠি ছিল। দ্বিতীয় দফায় বলা হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়, এবং বাকি সব ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে; যার উদ্দেশ্য ছিল করাচি বা ইসলামাবাদে পুঞ্জীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে পূর্ব বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঔপনিবেশিক শাসন খর্ব করা। অত্যন্ত সংবেদনশীল অর্থনৈতিক দিকটি প্রতিফলিত হয়েছিল তৃতীয় দফায়, যেখানে দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা রাখার দাবি করা হয়, অথবা পুরো দেশের জন্য একটিই মুদ্রা থাকলে সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয় যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন বা পুঁজি পাচার হতে না পারে; কারণ ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার পাট ও চা বিক্রি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে গড়ে উঠছিল করাচি ও লাহোরের মতো শহর, আর এই দফাটি ছিল বাঙালির নিজস্ব অর্থ ব্যবস্থার এক অনন্য রক্ষাকবচ। চতুর্থ দফায় কর, শুল্ক বা রাজস্ব ধার্য এবং আদায়ের কোনো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে না রেখে তা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে দেওয়ার দাবি করা হয়, যেখান থেকে আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেল সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য তহবিল হিসেবে জমা হবে; কারণ তৎকালীন সময়ে সিংহভাগ রাজস্ব পূর্ব বাংলা থেকে আদায় হলেও তার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের পেছনে। পঞ্চম দফায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পৃথক হিসাব রাখার এবং স্বাধীনভাবে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়, যা কার্যকর হলে পূর্ব পাকিস্তান নিজের আয়ে নিজে সমৃদ্ধ হতে পারত এবং পশ্চিম পাকিস্তানের পরজীবী অর্থনীতি এক বড় ধাক্কা খেত। সর্বশেষ ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কার্যকরভাবে একটি আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন এবং নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করার দাবি জানানো হয়; যার সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়, যখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও ভারতের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছয় দফা আন্দোলনই ছিল মূলত বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি এবং এক দফায় অর্থাৎ স্বাধীনতায় পৌঁছানোর একটা সুনিপুণ কৌশলগত সাঁকো। বঙ্গবন্ধু জানতেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কখনোই এই ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেবে না, আর তা না মানার অর্থই হলো পূর্ব বাংলার মানুষের সামনে এটি পরিষ্কার হয়ে যাওয়া যে পাকিস্তানের অধীনে কোনোদিন স্বাধিকার মিলবে না। শাসকগোষ্ঠী এই জনপ্রিয় আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে না পেরে শেষ অস্ত্র হিসেবে ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে ফাঁসি দেওয়ার চক্রান্ত করে, কিন্তু তা উল্টো গণমানুষের ক্ষোভকে দাবানলে রূপ দিয়ে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
এই গণ-আন্দোলনের জোয়ারেই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছয় দফার পক্ষে তাদের ঐতিহাসিক ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়। কিন্তু যখন পাকিস্তানি শাসকরা সেই গণতান্ত্রিক রায়কে বুলেটের মুখে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে, তখনই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতের পর শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যার অনিবার্য পরিণতিতে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ ছয় দশক পরও বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ জুনের গুরুত্ব একটুও ম্লান হয়নি, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল গভীর অর্থনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই মহান মাইলফলককে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতকে উদযাপন করা নয়, বরং যে শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন বুকে নিয়ে শহীদরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই আদর্শকে বর্তমান ও ভবিষ্যতে অক্ষুণ্ণ রাখার জাতীয় শপথ নেওয়া। ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবসে সকল শহীদের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

রোববার, ০৭ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
১৯৬৬ সালের ৭ জুন বাঙালির ইতিহাসে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টানোর দিন নয়, এটি ছিল পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কৃত্রিম ও অন্যায্য কাঠামোর ভেতরে শোষিত এক জাতির পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার পর ঘুরে দাঁড়ানোর দিন। আজ সেই ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। ৬০ বছর আগের এই দিনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কেঁপে উঠেছিল স্বাধিকারের তীব্র দাবিতে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পদ্ধতিগত শোষণ, চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতার বিরুদ্ধে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো কিংবদন্তি নেতারা আজীবন লড়াই করেছেন। তবে ষাটের দশকে এসে সেই দীর্ঘ সংগ্রামকে একটি সুনির্দিষ্ট, কাঠামোগত এবং আপসহীন রূপ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে তিনি উত্থাপন করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি, যা দ্রুতই রূপ নেয় বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক মুক্তির ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মুক্তির সনদে। এই কর্মসূচির মূল দর্শনটাই ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার-পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সম্পদ, রাজনীতি আর নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ থাকবে এ অঞ্চলের মানুষের হাতেই। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একে রাষ্ট্রের অখণ্ডতার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয়, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতালে। সেই দিন স্বাধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমে আসা হাজারো মানুষের ওপর টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে তৎকালীন পুলিশ ও ইপিআর নির্বিচারে গুলি চালালে মনু মিয়া, শফিক ও শামসুল হকসহ ১১ জন বীর বাঙালি শহীদ হন। এই রক্তের দাগই পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের চরিত্রকে চিরতরে ড্রয়িংরুমের রাজনীতি থেকে বের করে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও সাধারণ পেশাজীবীদের গণ-আন্দোলনে পরিণত করে এবং বাঙালি জাতিকে আপসহীন সংগ্রামের ধারায় ধাবিত করে।
ইতিহাসের আলোকে এই ছয় দফার প্রতিটি দিক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল মূলত পাকিস্তানের সংবিধানের ভেতরে থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার এক চরম গণতান্ত্রিক লড়াই।
কর্মসূচির প্রথম দফায় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেশন বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়, যেখানে সরকার হবে সংসদীয় পদ্ধতির এবং আইনসভা নির্বাচিত হবে প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে; যা মূলত আইয়ুব খানের 'বেসিক ডেমোক্রেসি' বা নিয়ন্ত্রিত একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতার মূল উৎস জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক চাবিকাঠি ছিল। দ্বিতীয় দফায় বলা হয়, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়, এবং বাকি সব ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে; যার উদ্দেশ্য ছিল করাচি বা ইসলামাবাদে পুঞ্জীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটিয়ে পূর্ব বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঔপনিবেশিক শাসন খর্ব করা। অত্যন্ত সংবেদনশীল অর্থনৈতিক দিকটি প্রতিফলিত হয়েছিল তৃতীয় দফায়, যেখানে দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা ব্যবস্থা রাখার দাবি করা হয়, অথবা পুরো দেশের জন্য একটিই মুদ্রা থাকলে সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয় যাতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন বা পুঁজি পাচার হতে না পারে; কারণ ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার পাট ও চা বিক্রি করে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে গড়ে উঠছিল করাচি ও লাহোরের মতো শহর, আর এই দফাটি ছিল বাঙালির নিজস্ব অর্থ ব্যবস্থার এক অনন্য রক্ষাকবচ। চতুর্থ দফায় কর, শুল্ক বা রাজস্ব ধার্য এবং আদায়ের কোনো ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে না রেখে তা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে দেওয়ার দাবি করা হয়, যেখান থেকে আদায়কৃত রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডারেল সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য তহবিল হিসেবে জমা হবে; কারণ তৎকালীন সময়ে সিংহভাগ রাজস্ব পূর্ব বাংলা থেকে আদায় হলেও তার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের পেছনে। পঞ্চম দফায় প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার পৃথক হিসাব রাখার এবং স্বাধীনভাবে বৈদেশিক বাণিজ্য ও বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়, যা কার্যকর হলে পূর্ব পাকিস্তান নিজের আয়ে নিজে সমৃদ্ধ হতে পারত এবং পশ্চিম পাকিস্তানের পরজীবী অর্থনীতি এক বড় ধাক্কা খেত। সর্বশেষ ষষ্ঠ দফায় পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কার্যকরভাবে একটি আধা-সামরিক বাহিনী বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন এবং নৌবাহিনীর সদর দফতর পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করার দাবি জানানো হয়; যার সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়, যখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা পূর্ব বাংলাকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত ও ভারতের দয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ছয় দফা আন্দোলনই ছিল মূলত বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি এবং এক দফায় অর্থাৎ স্বাধীনতায় পৌঁছানোর একটা সুনিপুণ কৌশলগত সাঁকো। বঙ্গবন্ধু জানতেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কখনোই এই ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নেবে না, আর তা না মানার অর্থই হলো পূর্ব বাংলার মানুষের সামনে এটি পরিষ্কার হয়ে যাওয়া যে পাকিস্তানের অধীনে কোনোদিন স্বাধিকার মিলবে না। শাসকগোষ্ঠী এই জনপ্রিয় আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে না পেরে শেষ অস্ত্র হিসেবে ১৯৬৮ সালে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে ফাঁসি দেওয়ার চক্রান্ত করে, কিন্তু তা উল্টো গণমানুষের ক্ষোভকে দাবানলে রূপ দিয়ে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।
এই গণ-আন্দোলনের জোয়ারেই ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছয় দফার পক্ষে তাদের ঐতিহাসিক ব্যালট বিপ্লব ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে নিরঙ্কুশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়। কিন্তু যখন পাকিস্তানি শাসকরা সেই গণতান্ত্রিক রায়কে বুলেটের মুখে স্তব্ধ করার চেষ্টা করে, তখনই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতের পর শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ, যার অনিবার্য পরিণতিতে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ ছয় দশক পরও বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ জুনের গুরুত্ব একটুও ম্লান হয়নি, কারণ এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল গভীর অর্থনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এই মহান মাইলফলককে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতকে উদযাপন করা নয়, বরং যে শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন বুকে নিয়ে শহীদরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন, সেই আদর্শকে বর্তমান ও ভবিষ্যতে অক্ষুণ্ণ রাখার জাতীয় শপথ নেওয়া। ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবসে সকল শহীদের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক।

আপনার মতামত লিখুন