ধরলা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা ও কুরুল এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। গত এক সপ্তাহে বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
একই সময়ে মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের আট গ্রামের প্রায় ৩৫০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নদীপাড়ের কৃষক ও বাসিন্দারা।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলার ধরলা নদীর ডান তীরে নির্মিত ১৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধই লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধ হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে প্রায় ১০ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার অংশ ভাঙন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। দীর্ঘদিনের নদীভাঙন ও নদীর প্রবল স্রোতের কারণে বাঁধটির বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পাউবো জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে লালমনিরহাট শহরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে পারে।
এদিকে ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক জাগায়। সে সময় কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবেরকুটি এলাকায় শহররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার অংশ ধসে পড়লে ধরলার পানি দ্রুত শহরে প্রবেশ করে।
এতে শহরের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়, শিশুসহ চারজনের মৃত্যু এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
কুরুল গ্রামের ৭০ বছর বয়সী কৃষক সুধির চন্দ্র জানান, এক যুগ আগে নদীভাঙনে তার ১০ বিঘা জমি হারিয়েছেন তিনি। এরপর অবশিষ্ট সাত বিঘার মধ্যে গত এক সপ্তাহেই আরও তিন বিঘা নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন বাকি চার বিঘা জমিও ভাঙনের মুখে।
তিনি আরো বলেন, “তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন জমি, কিন্তু সেটিও প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে।”
বুমকা এলাকার কৃষক রাম চন্দ্র বলেন, “গত এক যুগে তার ১৩ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। সম্প্রতি আরও দুই বিঘা জমি হারিয়ে এখন মাত্র চার বিঘা জমি নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কৃষিকাজ ছাড়া তাদের অন্য কোনো আয়ের পথ নেই বলেও জানান তিনি।”
ইটাপোতা এলাকার কৃষক হাফিজ মিয়া বলেন, “ শহররক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত রক্ষা করা না গেলে কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি ও কয়েক শত বসতভিটা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। তার মতে, বাঁধটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ধরলার ডান তীর দীর্ঘদিনের ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
কুলাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বলেন,“ ২০১৭ সালের মতো পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় লালমনিরহাট শহরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, ধরলা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি গত ১৫ এপ্রিল প্রি-একনেক (পিইসি) সভায় অনুমোদন পেয়েছে এবং বর্তমানে একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হলে শহররক্ষা বাঁধ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ এবং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করা যাবে।
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষার ভরা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও স্থায়ী নদীশাসনের কাজ শুরু করা হোক। তা না হলে ২০১৭ সালের মতো ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে তারা মন্তব্য করেন।

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
ধরলা নদীর অব্যাহত ভাঙনে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা ও কুরুল এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। গত এক সপ্তাহে বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
একই সময়ে মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের আট গ্রামের প্রায় ৩৫০ বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নদীপাড়ের কৃষক ও বাসিন্দারা।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), জনপ্রতিনিধি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদর উপজেলার ধরলা নদীর ডান তীরে নির্মিত ১৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধই লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধ হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে প্রায় ১০ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার অংশ ভাঙন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। দীর্ঘদিনের নদীভাঙন ও নদীর প্রবল স্রোতের কারণে বাঁধটির বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পাউবো জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে লালমনিরহাট শহরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে পারে।
এদিকে ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার স্মৃতি এখনও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক জাগায়। সে সময় কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবেরকুটি এলাকায় শহররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার অংশ ধসে পড়লে ধরলার পানি দ্রুত শহরে প্রবেশ করে।
এতে শহরের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়, শিশুসহ চারজনের মৃত্যু এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
কুরুল গ্রামের ৭০ বছর বয়সী কৃষক সুধির চন্দ্র জানান, এক যুগ আগে নদীভাঙনে তার ১০ বিঘা জমি হারিয়েছেন তিনি। এরপর অবশিষ্ট সাত বিঘার মধ্যে গত এক সপ্তাহেই আরও তিন বিঘা নদীতে বিলীন হয়েছে। এখন বাকি চার বিঘা জমিও ভাঙনের মুখে।
তিনি আরো বলেন, “তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন জমি, কিন্তু সেটিও প্রতিনিয়ত নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে।”
বুমকা এলাকার কৃষক রাম চন্দ্র বলেন, “গত এক যুগে তার ১৩ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। সম্প্রতি আরও দুই বিঘা জমি হারিয়ে এখন মাত্র চার বিঘা জমি নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। কৃষিকাজ ছাড়া তাদের অন্য কোনো আয়ের পথ নেই বলেও জানান তিনি।”
ইটাপোতা এলাকার কৃষক হাফিজ মিয়া বলেন, “ শহররক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত রক্ষা করা না গেলে কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি ও কয়েক শত বসতভিটা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। তার মতে, বাঁধটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ধরলার ডান তীর দীর্ঘদিনের ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আসবে।”
কুলাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বলেন,“ ২০১৭ সালের মতো পরিস্থিতি এড়াতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় লালমনিরহাট শহরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।”
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার জানান, ধরলা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি গত ১৫ এপ্রিল প্রি-একনেক (পিইসি) সভায় অনুমোদন পেয়েছে এবং বর্তমানে একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হলে শহররক্ষা বাঁধ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ এবং নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি অর্জন করা যাবে।
স্থানীয়দের দাবি, বর্ষার ভরা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও স্থায়ী নদীশাসনের কাজ শুরু করা হোক। তা না হলে ২০১৭ সালের মতো ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে তারা মন্তব্য করেন।

আপনার মতামত লিখুন