নীল সমুদ্র, দীর্ঘ বালুকাবেলা, পাহাড় আর পর্যটনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত কক্সবাজার। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে গত কয়েক বছরে বদলে গেছে জেলার কৌশলগত গুরুত্ব। এখন কক্সবাজার শুধু পর্যটনের শহর নয়; এটি একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল, মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট, মাদক ও সীমান্ত অপরাধের কেন্দ্র এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন রেল যোগাযোগ এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাব্য আঞ্চলিক করিডোর। ফলে কক্সবাজার এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
উদ্বাস্তু পুনর্বাসন থেকে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
কক্সবাজারের ইতিহাসের সঙ্গে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের সম্পর্ক বহু পুরনো। আঠারো শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স আরাকানি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়ে এ অঞ্চলে আসেন।
চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলে উদ্বাস্তুদের বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও কক্স বেছে নেন বাঁকখালী ও নাফ নদীর মধ্যবর্তী দক্ষিণাঞ্চল। বাঁকখালী নদীর তীরে বসতি স্থাপনের পাশাপাশি তিনি একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারেই ‘কক্সের বাজার’ নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কক্সের উদ্যোগের পেছনে মানবিকতার পাশাপাশি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্বার্থ। বনভূমি আবাদ, কৃষি সম্প্রসারণ, রাজস্ব আদায় এবং পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা বলয় তৈরির পরিকল্পনাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
দুই শতাব্দীর বেশি সময় পর কক্সবাজারের গুরুত্ব যেন আবারও সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে গেছে। উদ্বাস্তু, সীমান্ত ও নিরাপত্তার পুরনো বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বন্দর, বাণিজ্য, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা।
কুনমিং থেকে কক্সবাজার—নতুন করিডোরের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর কক্সবাজারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্ভাব্য একটি আঞ্চলিক যোগাযোগ করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে ইয়াঙ্গুন এবং রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে এর সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু বাংলাদেশের মানচিত্র দেখলেই হবে না। এর পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং কাছাকাছি রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে অঞ্চলটি বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
মাতারবাড়ী বদলে দিচ্ছে কক্সবাজারের অর্থনৈতিক পরিচয়
দীর্ঘদিন কক্সবাজারের অর্থনীতি পর্যটননির্ভর হলেও এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠছে বৃহৎ জ্বালানি ও বন্দর অবকাঠামো।
বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে। সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দরও।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের অর্থনীতি শুধু পর্যটননির্ভর থাকবে না। বন্দর, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক বলয় গড়ে উঠতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা হলে বড় প্রকল্পগুলোই ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটে বিশ্ববাসীর নজর
২০১৬ সালের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে বলে সরকারি তথ্য রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানব পাচার, মাদক এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি।
তাদের মতে, দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের প্রভাব শুধু কক্সবাজার নয়, পুরো অঞ্চলের ওপর পড়তে পারে।
মানব পাচারের ভয়ংকর রুট
কক্সবাজারের আরেকটি বড় বাস্তবতা মানব পাচার। সীমান্তবর্তী অবস্থান, সমুদ্রপথ এবং বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে পাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারী, শিশু ও তরুণদের দেশের বাইরে পাঠানোর নামে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কখনো সমুদ্রপথে, কখনো স্থলপথে তাদের পাচারের চেষ্টা করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় মানব পাচার বড় সমস্যা। বাস্তুচ্যুত বিপুল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে এ বিষয়ে অভিযান জোরদার করা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মানব পাচার বন্ধে শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাচারকারীদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, স্থানীয় দালালচক্র এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পথ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কক্সবাজারে নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ
কক্সবাজারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন বহুমাত্রিক। একদিকে মিয়ানমার সীমান্ত, অন্যদিকে সমুদ্রপথ। এর সঙ্গে রয়েছে শরণার্থী ক্যাম্প, মাদক চোরাচালান ও মানব পাচার।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, কক্সবাজারের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বন্দর, পর্যটন, সীমান্ত ও শরণার্থী—প্রতিটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সেন্টমার্টিন—রাজনীতি ও ভূরাজনীতির আলোচনায়
কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপও গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেন্টমার্টিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর দ্বীপটির পর্যটন, পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সেন্টমার্টিনের গুরুত্বকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এই দ্বীপকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয় জড়িত।
রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়
কক্সবাজারের রাজনৈতিক গুরুত্বও দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই এ জেলা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
চকরিয়ার হারবাং এলাকার খান বাহাদুর মৌলভি জালালুদ্দীন আহমদ বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য ছিলেন এবং অবিভক্ত বাংলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রামুর রশিদনগরের সন্তান মৌলভি ফরিদ আহমদ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী ছিলেন।
বর্তমান সময়েও জাতীয় রাজনীতিতে কক্সবাজারের প্রভাব রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক শিকড় এ জেলায়।
ফলে কক্সবাজারের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সীমান্তনীতি এখন জাতীয় রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সম্ভাবনা ও সংকটের সন্ধিক্ষণে কক্সবাজার
কক্সবাজারের সামনে এখন একদিকে বিপুল সম্ভাবনা, অন্যদিকে বড় চ্যালেঞ্জ।
পর্যটন, বন্দর, জ্বালানি, রেল, বিমানবন্দর ও আঞ্চলিক বাণিজ্য—সব মিলিয়ে জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ব্যাপক। কিন্তু একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, মানব পাচার, মাদক, সীমান্ত অপরাধ ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জাতীয় কৌশল।
পর্যটন উন্নয়নকে যেমন পরিবেশবান্ধব করতে হবে, তেমনি বন্দর ও অর্থনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, মানব পাচার দমন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করাও সমান জরুরি।
কারণ কক্সবাজার এখন আর শুধু পর্যটনের শহর নয়।
এটি একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংকটের কেন্দ্র, অন্যদিকে মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট। একই সঙ্গে এটি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
আর এ কারণেই কক্সবাজারের ওপর এখন শুধু বাংলাদেশের নয়—চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তিগুলোরও নজর।

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
নীল সমুদ্র, দীর্ঘ বালুকাবেলা, পাহাড় আর পর্যটনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত কক্সবাজার। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে গত কয়েক বছরে বদলে গেছে জেলার কৌশলগত গুরুত্ব। এখন কক্সবাজার শুধু পর্যটনের শহর নয়; এটি একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী জনগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল, মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট, মাদক ও সীমান্ত অপরাধের কেন্দ্র এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল, নতুন রেল যোগাযোগ এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাব্য আঞ্চলিক করিডোর। ফলে কক্সবাজার এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
উদ্বাস্তু পুনর্বাসন থেকে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব
কক্সবাজারের ইতিহাসের সঙ্গে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের সম্পর্ক বহু পুরনো। আঠারো শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স আরাকানি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিয়ে এ অঞ্চলে আসেন।
চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলে উদ্বাস্তুদের বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও কক্স বেছে নেন বাঁকখালী ও নাফ নদীর মধ্যবর্তী দক্ষিণাঞ্চল। বাঁকখালী নদীর তীরে বসতি স্থাপনের পাশাপাশি তিনি একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তার নামানুসারেই ‘কক্সের বাজার’ নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কক্সের উদ্যোগের পেছনে মানবিকতার পাশাপাশি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্বার্থ। বনভূমি আবাদ, কৃষি সম্প্রসারণ, রাজস্ব আদায় এবং পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা বলয় তৈরির পরিকল্পনাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
দুই শতাব্দীর বেশি সময় পর কক্সবাজারের গুরুত্ব যেন আবারও সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে গেছে। উদ্বাস্তু, সীমান্ত ও নিরাপত্তার পুরনো বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বন্দর, বাণিজ্য, জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা।
কুনমিং থেকে কক্সবাজার—নতুন করিডোরের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর কক্সবাজারকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত সম্ভাব্য একটি আঞ্চলিক যোগাযোগ করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালয় হয়ে ইয়াঙ্গুন এবং রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে এর সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামকে যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারের গুরুত্ব বোঝার জন্য শুধু বাংলাদেশের মানচিত্র দেখলেই হবে না। এর পূর্বে মিয়ানমারের রাখাইন, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং কাছাকাছি রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। ফলে অঞ্চলটি বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
মাতারবাড়ী বদলে দিচ্ছে কক্সবাজারের অর্থনৈতিক পরিচয়
দীর্ঘদিন কক্সবাজারের অর্থনীতি পর্যটননির্ভর হলেও এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। মহেশখালী-মাতারবাড়ী অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠছে বৃহৎ জ্বালানি ও বন্দর অবকাঠামো।
বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে। সম্প্রসারণ করা হচ্ছে কক্সবাজার বিমানবন্দরও।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে কক্সবাজারের অর্থনীতি শুধু পর্যটননির্ভর থাকবে না। বন্দর, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক বলয় গড়ে উঠতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করা হলে বড় প্রকল্পগুলোই ভবিষ্যতে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গা সংকটে বিশ্ববাসীর নজর
২০১৬ সালের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
উখিয়া ও টেকনাফে গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে বলে সরকারি তথ্য রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মানব পাচার, মাদক এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকি।
তাদের মতে, দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংকটের প্রভাব শুধু কক্সবাজার নয়, পুরো অঞ্চলের ওপর পড়তে পারে।
মানব পাচারের ভয়ংকর রুট
কক্সবাজারের আরেকটি বড় বাস্তবতা মানব পাচার। সীমান্তবর্তী অবস্থান, সমুদ্রপথ এবং বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে পাচারকারীরা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারী, শিশু ও তরুণদের দেশের বাইরে পাঠানোর নামে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কখনো সমুদ্রপথে, কখনো স্থলপথে তাদের পাচারের চেষ্টা করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, টেকনাফসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় মানব পাচার বড় সমস্যা। বাস্তুচ্যুত বিপুল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে এ বিষয়ে অভিযান জোরদার করা হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, মানব পাচার বন্ধে শুধু মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। পাচারকারীদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক, স্থানীয় দালালচক্র এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পথ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কক্সবাজারে নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ
কক্সবাজারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন বহুমাত্রিক। একদিকে মিয়ানমার সীমান্ত, অন্যদিকে সমুদ্রপথ। এর সঙ্গে রয়েছে শরণার্থী ক্যাম্প, মাদক চোরাচালান ও মানব পাচার।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, কক্সবাজারের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বন্দর, পর্যটন, সীমান্ত ও শরণার্থী—প্রতিটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সেন্টমার্টিন—রাজনীতি ও ভূরাজনীতির আলোচনায়
কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপও গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আলোচনায় উঠে এসেছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেন্টমার্টিন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
পরবর্তীতে সরকার পরিবর্তনের পর দ্বীপটির পর্যটন, পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সেন্টমার্টিনের গুরুত্বকে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা এই দ্বীপকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিষয় জড়িত।
রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়
কক্সবাজারের রাজনৈতিক গুরুত্বও দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই এ জেলা জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
চকরিয়ার হারবাং এলাকার খান বাহাদুর মৌলভি জালালুদ্দীন আহমদ বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য ছিলেন এবং অবিভক্ত বাংলার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রামুর রশিদনগরের সন্তান মৌলভি ফরিদ আহমদ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী ছিলেন।
বর্তমান সময়েও জাতীয় রাজনীতিতে কক্সবাজারের প্রভাব রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতার রাজনৈতিক শিকড় এ জেলায়।
ফলে কক্সবাজারের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সীমান্তনীতি এখন জাতীয় রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সম্ভাবনা ও সংকটের সন্ধিক্ষণে কক্সবাজার
কক্সবাজারের সামনে এখন একদিকে বিপুল সম্ভাবনা, অন্যদিকে বড় চ্যালেঞ্জ।
পর্যটন, বন্দর, জ্বালানি, রেল, বিমানবন্দর ও আঞ্চলিক বাণিজ্য—সব মিলিয়ে জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ব্যাপক। কিন্তু একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট, মানব পাচার, মাদক, সীমান্ত অপরাধ ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জাতীয় কৌশল।
পর্যটন উন্নয়নকে যেমন পরিবেশবান্ধব করতে হবে, তেমনি বন্দর ও অর্থনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, মানব পাচার দমন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করাও সমান জরুরি।
কারণ কক্সবাজার এখন আর শুধু পর্যটনের শহর নয়।
এটি একদিকে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী সংকটের কেন্দ্র, অন্যদিকে মানব পাচারের ঝুঁকিপূর্ণ রুট। একই সঙ্গে এটি বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
আর এ কারণেই কক্সবাজারের ওপর এখন শুধু বাংলাদেশের নয়—চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিশ্বের প্রভাবশালী শক্তিগুলোরও নজর।

আপনার মতামত লিখুন