মুক্তির লড়াই

মতামত

কিশোর গ্যাং: এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি, যেন ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আতঙ্ক

কিশোর গ্যাং: এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি, যেন ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আতঙ্ক

গত এক মাসের খবরগুলো পড়লে বুক কেঁপে ওঠে। ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের গলি-সবখানেই একই ছবি। কিশোর গ্যাং। নামে ‘কিশোর’, কাজে ভয়ংকর। ছুরি-চাপাতি হাতে মহড়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, আর এখন হত্যাও। এ যেন এক সামাজিক ক্যান্সার, যা ধীরে ধীরে পুরো জাতির শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরদিন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার রক্তাক্ত মরদেহ। মাথায় বাঁশের লাঠির আঘাত। প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছরের সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ আরও কয়েকজন কিশোর গ্রেপ্তার হয়। তুহিন নিজেই একটি গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল। টিকটকের ভিডিও, অস্ত্রের মহড়া, ‘হিরো’ হওয়ার নেশা-সব মিলেমিশে এক নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেয়। অপ্রতিমের বাবা বলেন, “দশটা ফোন চাইলেও দিতাম।” কিন্তু ফোনের জন্যই শিশু হত্যা!

এ ঘটনার পর কুমিল্লায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। অনেককে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়, কেউ কেউ মাদক ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকায় আদালতে পাঠানো হয়। অপরাধ সন্দেহে দাউদকান্দি থানায় আটকের পর কিছু কিশোর থানার আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে যায়। কুমিল্লা শহরেই অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয়। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধে এদের নাম এসেছে। টিকটকে অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ভয়ে শাটার নামিয়ে দোকানে ঢুকে পড়ছেন।

রাজধানীতেও কম নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে কিশোর গ্যাং হামলা চালায়। কর্মচারী ইমরানকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। ডিএমপি কমিশনার ঘোষণা দিয়েছেন, “মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না।” কিন্তু ঘোষণার দুদিন পরই এমন ঘটনা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কিশোর গ্যাং লিডার ‘কুত্তা শ্রাবণ’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়। চাঁদাবাজি, ছিনতাই-সবই তার দলের কাজ।

র‍্যাবের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে এখন ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। আগে ছিল ২৩৭টি। ঢাকায় একাই ১২৭ থেকে ১৫৯টি গ্যাং। সারা দেশে সদস্য সংখ্যা হাজার হাজার। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা-কোথাও বাদ যায়নি। অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোরদের হাতে। খুন, ছিনতাই, চাঁদা, মাদক, ধর্ষণ-সবই।

চাঁদার জন্য পরিবারে ছুরি, নদীর তীরে অস্ত্রের মহড়া শুধু ঢাকা-কুমিল্লা নয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বরই কক্সবাজারের পেকুয়ায় এক সাংবাদিক পরিবারের ওপর নৃশংস হামলা চালায় স্থানীয় কিশোর গ্যাং। বাড়ি নির্মাণের সময় পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় কিরিচ ও হাতুড়ি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় নুর মোহাম্মদ, তার স্ত্রী কহিনুর আক্তার ও ছেলে মনিরুল মোস্তফাকে। রক্তাক্ত পরিবার, ভাঙা স্বপ্ন-এ যেন এক নতুন বাস্তবতা।

বরিশাল নগরীতেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মোটরসাইকেলে চড়ে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নদীর তীরে একে অন্যের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা ভয়ে কাঁপছেন। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুই ডজনের বেশি গ্যাং সক্রিয়। চট্টগ্রামে শতাধিক গ্রুপ, রাজশাহীতে ছিনতাই-মারধর, ঢাকার দক্ষিণখানে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ সাত সদস্য গ্রেপ্তার-সবখানেই একই কাহিনি। পল্লবীর সবুজবাংলায় গণমাধ্যমকর্মীর বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনাও ঘটেছে। দেশজুড়ে এখন প্রায় ৩৮৬ থেকে ৪০০টি গ্যাং, সদস্য সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি।

কেন এমন হচ্ছে? অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, নাকি আরো ভয়ংকর কিছু? 

সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় নেই, স্ক্রিন সময় বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারির অভাব। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কিশোরদের হাতিয়ার বানাচ্ছে। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা ভঙ্গুর, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল। মাদকের অবাধ বিচরণ। অনলাইন জুয়া ও টিকটক-ফেসবুকের নেশায় কিশোররা ‘হিরো’ হতে চায়। দ্রুত টাকা, ক্ষমতা, ভয় দেখানোর আকাঙ্ক্ষা। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, মূল্যবোধ হারাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া যেন গ্যাং তৈরির নতুন কারখানা।

এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে? এক প্রজন্ম যদি অস্ত্র হাতে বেড়ে ওঠে, তাহলে সমাজ কীভাবে বাঁচবে? রাষ্ট্র কীভাবে?

একমাত্র পুলিশ নয়, পুরো জাতিকে জাগতে হবে

করণীয় একমাত্র পুলিশি অভিযান নয়। এটি বহুমুখী যুদ্ধ।

পরিবারকে ফিরে আসতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে। রাতের আড্ডা, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার, অদ্ভুত বন্ধুত্ব-সবকিছুতে নজর রাখতে হবে। স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং চালু করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে বিকল্প পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্যাংয়ের বদলে স্পোর্টস ক্লাব, যুব ক্লাব গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রকে শক্ত হতে হবে। কিশোর অপরাধীদের জন্য বিশেষ আইন ও সংশোধনাগার জোরদার করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে বারবার মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সোশ্যাল মিডিয়ায় সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা।

সমাজকে জাগতে হবে। পাড়া-মহল্লায় কমিটি গড়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ-সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকে শুধু খবর নয়, সচেতনতা তৈরির মাধ্যমও হতে হবে।

কিশোর গ্যাং কোনো অমোঘ বিপর্যয় নয়। এটি আমাদের ব্যর্থতার ফসল। আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি, তাহলে আগামী প্রজন্ম হাতের মুঠোয় অস্ত্র নিয়ে বেড়ে উঠবে। অপ্রতিমের মতো নিষ্পাপ শিশুরা আরও মরবে। ঘরে ঘরে আতঙ্ক বাড়বে।

সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-সবাই মিলে যদি একযোগে দাঁড়ায়, তাহলে এই ভয়ংকর ব্যাধি থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হতে পারে। একটি সুস্থ, নিরাপদ, মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, সাহস এবং ঐক্য।

আজকের কিশোর আগামীর নাগরিক। তাদের হাতে অস্ত্র নয়, কলম ও স্বপ্ন তুলে দিতে হবে। নয়তো ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। 

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কিশোর গ্যাং: এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি, যেন ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আতঙ্ক

প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

গত এক মাসের খবরগুলো পড়লে বুক কেঁপে ওঠে। ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের গলি-সবখানেই একই ছবি। কিশোর গ্যাং। নামে ‘কিশোর’, কাজে ভয়ংকর। ছুরি-চাপাতি হাতে মহড়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক, আর এখন হত্যাও। এ যেন এক সামাজিক ক্যান্সার, যা ধীরে ধীরে পুরো জাতির শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরদিন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার রক্তাক্ত মরদেহ। মাথায় বাঁশের লাঠির আঘাত। প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছরের সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ আরও কয়েকজন কিশোর গ্রেপ্তার হয়। তুহিন নিজেই একটি গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল। টিকটকের ভিডিও, অস্ত্রের মহড়া, ‘হিরো’ হওয়ার নেশা-সব মিলেমিশে এক নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেয়। অপ্রতিমের বাবা বলেন, “দশটা ফোন চাইলেও দিতাম।” কিন্তু ফোনের জন্যই শিশু হত্যা!

এ ঘটনার পর কুমিল্লায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। অনেককে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়, কেউ কেউ মাদক ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকায় আদালতে পাঠানো হয়। অপরাধ সন্দেহে দাউদকান্দি থানায় আটকের পর কিছু কিশোর থানার আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে যায়। কুমিল্লা শহরেই অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয়। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধে এদের নাম এসেছে। টিকটকে অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ভয়ে শাটার নামিয়ে দোকানে ঢুকে পড়ছেন।

রাজধানীতেও কম নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে কিশোর গ্যাং হামলা চালায়। কর্মচারী ইমরানকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। ডিএমপি কমিশনার ঘোষণা দিয়েছেন, “মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না।” কিন্তু ঘোষণার দুদিন পরই এমন ঘটনা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কিশোর গ্যাং লিডার ‘কুত্তা শ্রাবণ’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়। চাঁদাবাজি, ছিনতাই-সবই তার দলের কাজ।

র‍্যাবের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে এখন ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। আগে ছিল ২৩৭টি। ঢাকায় একাই ১২৭ থেকে ১৫৯টি গ্যাং। সারা দেশে সদস্য সংখ্যা হাজার হাজার। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা-কোথাও বাদ যায়নি। অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোরদের হাতে। খুন, ছিনতাই, চাঁদা, মাদক, ধর্ষণ-সবই।

চাঁদার জন্য পরিবারে ছুরি, নদীর তীরে অস্ত্রের মহড়া শুধু ঢাকা-কুমিল্লা নয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বরই কক্সবাজারের পেকুয়ায় এক সাংবাদিক পরিবারের ওপর নৃশংস হামলা চালায় স্থানীয় কিশোর গ্যাং। বাড়ি নির্মাণের সময় পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় কিরিচ ও হাতুড়ি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় নুর মোহাম্মদ, তার স্ত্রী কহিনুর আক্তার ও ছেলে মনিরুল মোস্তফাকে। রক্তাক্ত পরিবার, ভাঙা স্বপ্ন-এ যেন এক নতুন বাস্তবতা।

বরিশাল নগরীতেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মোটরসাইকেলে চড়ে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নদীর তীরে একে অন্যের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা ভয়ে কাঁপছেন। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুই ডজনের বেশি গ্যাং সক্রিয়। চট্টগ্রামে শতাধিক গ্রুপ, রাজশাহীতে ছিনতাই-মারধর, ঢাকার দক্ষিণখানে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ সাত সদস্য গ্রেপ্তার-সবখানেই একই কাহিনি। পল্লবীর সবুজবাংলায় গণমাধ্যমকর্মীর বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনাও ঘটেছে। দেশজুড়ে এখন প্রায় ৩৮৬ থেকে ৪০০টি গ্যাং, সদস্য সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি।

কেন এমন হচ্ছে? অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, নাকি আরো ভয়ংকর কিছু? 

সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় নেই, স্ক্রিন সময় বাড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারির অভাব। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কিশোরদের হাতিয়ার বানাচ্ছে। রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা ভঙ্গুর, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল। মাদকের অবাধ বিচরণ। অনলাইন জুয়া ও টিকটক-ফেসবুকের নেশায় কিশোররা ‘হিরো’ হতে চায়। দ্রুত টাকা, ক্ষমতা, ভয় দেখানোর আকাঙ্ক্ষা। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, মূল্যবোধ হারাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া যেন গ্যাং তৈরির নতুন কারখানা।

এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে? এক প্রজন্ম যদি অস্ত্র হাতে বেড়ে ওঠে, তাহলে সমাজ কীভাবে বাঁচবে? রাষ্ট্র কীভাবে?

একমাত্র পুলিশ নয়, পুরো জাতিকে জাগতে হবে

করণীয় একমাত্র পুলিশি অভিযান নয়। এটি বহুমুখী যুদ্ধ।

পরিবারকে ফিরে আসতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে। রাতের আড্ডা, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার, অদ্ভুত বন্ধুত্ব-সবকিছুতে নজর রাখতে হবে। স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং চালু করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে বিকল্প পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্যাংয়ের বদলে স্পোর্টস ক্লাব, যুব ক্লাব গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রকে শক্ত হতে হবে। কিশোর অপরাধীদের জন্য বিশেষ আইন ও সংশোধনাগার জোরদার করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে বারবার মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সোশ্যাল মিডিয়ায় সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা।

সমাজকে জাগতে হবে। পাড়া-মহল্লায় কমিটি গড়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজ-সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকে শুধু খবর নয়, সচেতনতা তৈরির মাধ্যমও হতে হবে।

কিশোর গ্যাং কোনো অমোঘ বিপর্যয় নয়। এটি আমাদের ব্যর্থতার ফসল। আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি, তাহলে আগামী প্রজন্ম হাতের মুঠোয় অস্ত্র নিয়ে বেড়ে উঠবে। অপ্রতিমের মতো নিষ্পাপ শিশুরা আরও মরবে। ঘরে ঘরে আতঙ্ক বাড়বে।

সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-সবাই মিলে যদি একযোগে দাঁড়ায়, তাহলে এই ভয়ংকর ব্যাধি থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হতে পারে। একটি সুস্থ, নিরাপদ, মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, সাহস এবং ঐক্য।

আজকের কিশোর আগামীর নাগরিক। তাদের হাতে অস্ত্র নয়, কলম ও স্বপ্ন তুলে দিতে হবে। নয়তো ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। 


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই