মুক্তির লড়াই

মতামত

বেশি দামেও মিলছেনা সিলিন্ডার গ্যাস, রান্না ঘরের আগুন নেভার আশঙ্কা

বেশি দামেও মিলছেনা সিলিন্ডার গ্যাস, রান্না ঘরের আগুন নেভার আশঙ্কা

দেশের রান্নাঘরে আজ যেন আগুন নেভার আশঙ্কা। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে যে সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তার সংকট। সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না, বাড়তি দামেও পাওয়া যাচ্ছে না। দোকান বন্ধ, মোবাইল কোর্টের ভয়ে বিক্রেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আর গৃহিণী থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-সবাই হতাশায় ডুবে। এই পরিস্থিতি কেবল বাজারের অস্থিরতা নয়; এটি নীতি, ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ববোধের গভীর ব্যর্থতার নিদর্শন।

পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় ২০১০ সাল থেকে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন নির্মিত অধিকাংশ ভবনে তিতাসের লাইন নেই। গ্রামে জ্বালানি কাঠের অভাবেও সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। ফলে আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলাতে পারেনি। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাজারে তীব্র সংকট চলছে। ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা থাকলেও তা আড়াই হাজার টাকাতেও মিলছে না। পরে দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছে, তবুও নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ৩৫ কেজির সিলিন্ডারে এক হাজার টাকারও বেশি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না-এমন অভিযোগ এখন সর্বত্র।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তা অধিদপ্তরের লোকজন আসার ভয়ে মালিকরা দোকান বন্ধ রেখেছেন। পরিচিতদের বাসায় গ্যাস পৌঁছে দিয়ে দ্বিগুণ দাম নিচ্ছেন কেউ কেউ। ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও মোবাইল কোর্টের ভয়ে বিক্রি বন্ধ। মানিকগঞ্জে দুই ডিলারকে দেড় লাখ টাকা, সাভারে ৫৪ হাজার টাকা, মুন্সীগঞ্জে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে। কিন্তু জরিমানা দিয়ে সংকট সমাধান হয় না। বরং দোকান বন্ধ হয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ভোক্তারা ফোন করে অনুরোধ করছেন, তবুও সিলিন্ডার মিলছে না। এই খবর শুধু ঢাকার নয়-সারাদেশের।

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশে এলপিজির চরম সংকটময় সময় চলছে। পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিইআরসি নতুন দর ঘোষণা করেছে। দেশে ২৭টি কোম্পানি প্রায় সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করেছে। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল হচ্ছে-যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বেশিরভাগ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবেশকরা দেউলিয়ার পথে। তারা ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন-এলপিজি বহনকারী গাড়ির পুলিশি হয়রানি বন্ধ, ভোক্তা অধিকারের অভিযান স্থগিত, পরিবেশকদের কমিশন ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৭০ টাকা বৃদ্ধিসহ। ব্যবসায়ী নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলে সারাদেশে এলপিজি ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত দামে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বাজারমূল্য ও খরচের সঙ্গে সমন্বয় না করে দাম নির্ধারণ করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, সরবরাহকারীরা আগে তাদের কাছে আসেননি। তারা চিঠি দিয়েছেন, বৈঠক হবে। জরুরি ভিত্তিতে আমদানির বিষয়ে আলোচনা হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু এই আশ্বাস ভোক্তাদের ভোগান্তি কমাচ্ছে না।

দাম বৃদ্ধির পেছনে বিইআরসির ব্যাখ্যা হলো আন্তর্জাতিক বাজার। সৌদি আরামকোর অক্টোবর মাসের প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি সিপি বেড়েছে। গড় সৌদি সিপি ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার হয়েছে। জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়ামও বেড়েছে ৯০ ডলার। ডলারের বিনিময় হার প্রায় একই থাকলেও আন্তর্জাতিক ব্যয় বৃদ্ধিই দাম বাড়ানোর প্রধান কারণ। অক্টোবরের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছে। প্রতি কেজিতে ভ্যাটসহ দাম ১৩২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা হয়েছে। অটোগ্যাসের দামও লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দামও একইসঙ্গে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ালেই সংকট কাটে না। সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থাকলেও বাজারে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নতুন দামেও যদি একই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

সরবরাহ সংকট নিয়ে পক্ষভেদে বক্তব্য ভিন্ন। সরকার ও আমদানিকারকদের একাংশ বলছেন মজুত সন্তোষজনক। খুচরা বাজার বলছে নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না। 

আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও কার্গো সংকটের কথা বলছেন। ডিলাররা অভিযোগ করছেন কোম্পানিগুলো প্রয়োজনমতো সরবরাহ দিচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি এনএসআইয়ের এক প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা এলপিজির অংশ বাজারে না ছেড়ে মজুত রাখার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। এই অস্পষ্টতাই বাজারের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই সংকটের গভীরে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা। 

পাইপলাইন গ্যাসের অভাবে এলপিজির ওপর চাপ বেড়েছে, কিন্তু আমদানি, মজুত, বিতরণ ও মূল্য নির্ধারণের মধ্যে সমন্বয় নেই। গণশুনানি ছাড়া দাম বাড়ানোর অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। কমিশন না বাড়িয়ে শুধু দাম নির্ধারণ করলে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েন, আর ভোক্তারা বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য হন। জাহাজ সংকটে আমদানি ৩০ ভাগ কমেছে বলে বিইআরসি চেয়ারম্যান নিজেই স্বীকার করেছেন। শীতকালে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন কমে-এটিও একটি বাস্তবতা। কিন্তু দেশীয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবই মূল সমস্যা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন সংকট বাড়ায় না। দোকান বন্ধ করে দিলে সরবরাহ আরও কমে। ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক কমিশন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্ধারিত দামে বিক্রি সম্ভব হয়। আমদানিকারকদের মজুত ও বিতরণ নিয়মিত মনিটর করতে হবে। 

এনএসআইয়ের সুপারিশ অনুযায়ী চালান, খালাস ও বাজারে ছাড়ার তথ্য পর্যালোচনা জরুরি। একইসঙ্গে পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ সম্প্রসারণ ও সরবরাহ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এলপিজির ওপর চাপ কমবে না।

এলপিজি এখন শহর ও গ্রামের কোটি মানুষের রান্নার প্রধান অবলম্বন। এর সংকট মানে পরিবারের বাজেটে চাপ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব সংকট, এবং সামাজিক অস্থিরতা। সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারলে দাম বাড়ানোর কোনো অর্থ নেই। বাজার তদারকি, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ-এই তিনটি পদক্ষেপ এখন জরুরি। অন্যথায় চুলার আগুন নিভে যাবে, আর সেই অন্ধকারে ভোক্তার আর্তনাদ আরও জোরে শোনা যাবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল নীতির কাগজে নয়, প্রতিটি রান্নাঘরে নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই সংকট কেবল গ্যাসের নয়-বিশ্বাসেরও সংকট হয়ে উঠবে।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। 

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


বেশি দামেও মিলছেনা সিলিন্ডার গ্যাস, রান্না ঘরের আগুন নেভার আশঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

দেশের রান্নাঘরে আজ যেন আগুন নেভার আশঙ্কা। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে যে সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে এটি নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তার সংকট। সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না, বাড়তি দামেও পাওয়া যাচ্ছে না। দোকান বন্ধ, মোবাইল কোর্টের ভয়ে বিক্রেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, আর গৃহিণী থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী-সবাই হতাশায় ডুবে। এই পরিস্থিতি কেবল বাজারের অস্থিরতা নয়; এটি নীতি, ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ববোধের গভীর ব্যর্থতার নিদর্শন।

পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় ২০১০ সাল থেকে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নতুন নির্মিত অধিকাংশ ভবনে তিতাসের লাইন নেই। গ্রামে জ্বালানি কাঠের অভাবেও সিলিন্ডার গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে। ফলে আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলাতে পারেনি। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাজারে তীব্র সংকট চলছে। ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩০৬ টাকা থাকলেও তা আড়াই হাজার টাকাতেও মিলছে না। পরে দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছে, তবুও নির্ধারিত মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ৩৫ কেজির সিলিন্ডারে এক হাজার টাকারও বেশি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। নির্ধারিত দামের দ্বিগুণ টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না-এমন অভিযোগ এখন সর্বত্র।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তা অধিদপ্তরের লোকজন আসার ভয়ে মালিকরা দোকান বন্ধ রেখেছেন। পরিচিতদের বাসায় গ্যাস পৌঁছে দিয়ে দ্বিগুণ দাম নিচ্ছেন কেউ কেউ। ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলা পর্যায়েও মোবাইল কোর্টের ভয়ে বিক্রি বন্ধ। মানিকগঞ্জে দুই ডিলারকে দেড় লাখ টাকা, সাভারে ৫৪ হাজার টাকা, মুন্সীগঞ্জে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে। কিন্তু জরিমানা দিয়ে সংকট সমাধান হয় না। বরং দোকান বন্ধ হয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ভোক্তারা ফোন করে অনুরোধ করছেন, তবুও সিলিন্ডার মিলছে না। এই খবর শুধু ঢাকার নয়-সারাদেশের।

এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খান সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশে এলপিজির চরম সংকটময় সময় চলছে। পরিবেশকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই বিইআরসি নতুন দর ঘোষণা করেছে। দেশে ২৭টি কোম্পানি প্রায় সাড়ে ৫ কোটি সিলিন্ডার বাজারজাত করেছে। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ সিলিন্ডারে গ্যাস রিফিল হচ্ছে-যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। বেশিরভাগ কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবেশকরা দেউলিয়ার পথে। তারা ছয় দফা দাবি জানিয়েছেন-এলপিজি বহনকারী গাড়ির পুলিশি হয়রানি বন্ধ, ভোক্তা অধিকারের অভিযান স্থগিত, পরিবেশকদের কমিশন ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৭০ টাকা বৃদ্ধিসহ। ব্যবসায়ী নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লোকসান দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হলে সারাদেশে এলপিজি ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হবে। তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত দামে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বাজারমূল্য ও খরচের সঙ্গে সমন্বয় না করে দাম নির্ধারণ করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, সরবরাহকারীরা আগে তাদের কাছে আসেননি। তারা চিঠি দিয়েছেন, বৈঠক হবে। জরুরি ভিত্তিতে আমদানির বিষয়ে আলোচনা হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু এই আশ্বাস ভোক্তাদের ভোগান্তি কমাচ্ছে না।

দাম বৃদ্ধির পেছনে বিইআরসির ব্যাখ্যা হলো আন্তর্জাতিক বাজার। সৌদি আরামকোর অক্টোবর মাসের প্রোপেন ও বিউটেনের সৌদি সিপি বেড়েছে। গড় সৌদি সিপি ৬৪৭ দশমিক ৭৫ ডলার থেকে বেড়ে ৭১২ দশমিক ৫০ ডলার হয়েছে। জাহাজভাড়া ও প্রিমিয়ামও বেড়েছে ৯০ ডলার। ডলারের বিনিময় হার প্রায় একই থাকলেও আন্তর্জাতিক ব্যয় বৃদ্ধিই দাম বাড়ানোর প্রধান কারণ। অক্টোবরের জন্য ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়েছে। প্রতি কেজিতে ভ্যাটসহ দাম ১৩২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা হয়েছে। অটোগ্যাসের দামও লিটারে ১১ টাকা ৫৩ পয়সা বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডারের দামও একইসঙ্গে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ালেই সংকট কাটে না। সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থাকলেও বাজারে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। নতুন দামেও যদি একই অবস্থা চলতে থাকে, তাহলে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়বে।

সরবরাহ সংকট নিয়ে পক্ষভেদে বক্তব্য ভিন্ন। সরকার ও আমদানিকারকদের একাংশ বলছেন মজুত সন্তোষজনক। খুচরা বাজার বলছে নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না। 

আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও কার্গো সংকটের কথা বলছেন। ডিলাররা অভিযোগ করছেন কোম্পানিগুলো প্রয়োজনমতো সরবরাহ দিচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি এনএসআইয়ের এক প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা এলপিজির অংশ বাজারে না ছেড়ে মজুত রাখার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি। এই অস্পষ্টতাই বাজারের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এই সংকটের গভীরে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা। 

পাইপলাইন গ্যাসের অভাবে এলপিজির ওপর চাপ বেড়েছে, কিন্তু আমদানি, মজুত, বিতরণ ও মূল্য নির্ধারণের মধ্যে সমন্বয় নেই। গণশুনানি ছাড়া দাম বাড়ানোর অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। কমিশন না বাড়িয়ে শুধু দাম নির্ধারণ করলে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়েন, আর ভোক্তারা বাড়তি দামে কিনতে বাধ্য হন। জাহাজ সংকটে আমদানি ৩০ ভাগ কমেছে বলে বিইআরসি চেয়ারম্যান নিজেই স্বীকার করেছেন। শীতকালে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ে, উৎপাদন কমে-এটিও একটি বাস্তবতা। কিন্তু দেশীয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবই মূল সমস্যা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন সংকট বাড়ায় না। দোকান বন্ধ করে দিলে সরবরাহ আরও কমে। ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক কমিশন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নির্ধারিত দামে বিক্রি সম্ভব হয়। আমদানিকারকদের মজুত ও বিতরণ নিয়মিত মনিটর করতে হবে। 

এনএসআইয়ের সুপারিশ অনুযায়ী চালান, খালাস ও বাজারে ছাড়ার তথ্য পর্যালোচনা জরুরি। একইসঙ্গে পাইপলাইন গ্যাসের সংযোগ সম্প্রসারণ ও সরবরাহ বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এলপিজির ওপর চাপ কমবে না।

এলপিজি এখন শহর ও গ্রামের কোটি মানুষের রান্নার প্রধান অবলম্বন। এর সংকট মানে পরিবারের বাজেটে চাপ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অস্তিত্ব সংকট, এবং সামাজিক অস্থিরতা। সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে না পারলে দাম বাড়ানোর কোনো অর্থ নেই। বাজার তদারকি, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ-এই তিনটি পদক্ষেপ এখন জরুরি। অন্যথায় চুলার আগুন নিভে যাবে, আর সেই অন্ধকারে ভোক্তার আর্তনাদ আরও জোরে শোনা যাবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা কেবল নীতির কাগজে নয়, প্রতিটি রান্নাঘরে নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই সংকট কেবল গ্যাসের নয়-বিশ্বাসেরও সংকট হয়ে উঠবে।

লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। 


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই