কুমিল্লার দেবিদ্বারে নিজ মা ও আট মাসের শিশুকে হত্যা, যুবক ইমন গ্রেপ্তার
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার বড়শালঘর গ্রামে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, ২৫ বছর বয়সী যুবক ইমন তার মা পেয়ারা বেগম (৬৫) ও আট মাস বয়সী ভাতিজি ইসরাতকে হত্যা করেছে। মা ও শিশুকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা শাশুড়ি রায়েয়া বেগম (৩৫) গুরুতর আহত হয়েছেন।ঘটনাস্থল ছিল বড়শালঘর ইউনিয়নের দক্ষিণ পাড়ার মোস্তফা মাস্টারের বাড়ি। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ইমন হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে মাকে আক্রমণ করে হত্যা করে। এরপর শিশু ভাতিজিকেও হত্যা করে। বাধা দিতে এগিয়ে আসা রায়েয়া বেগমকেও আক্রমণ করা হয়। স্থানীয়রা দ্রুত এগিয়ে এসে আহত রায়েয়াকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান এবং ইমনকে আটক করে একটি ঘরে আটকে রাখেন। পরে পুলিশ এলে তাকে হস্তান্তর করা হয়।দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, অভিযুক্ত ইমনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ইমন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তবে ঘটনার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
‘ফটোভোলটাইক-পশুপালন’ মডেলে মরুভূমির নতুন জীবন
ছিংহাই প্রদেশের তা লা সৈকতের সবুজ রূপান্তর, টেকসই উন্নয়নে চীনের উদ্ভাবনী পদ্ধতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একসময়কার ঊষর গোবি মরুভূমি, যার মরুকরণের হার ছিল ৯৮.৫ শতাংশ পর্যন্ত, একটিমাত্র ফটোভোলটাইক শক্তি প্রকল্পের কল্যাণে এক অপ্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করেছে।প্রাথমিকভাবে পরিচ্ছন্ন শক্তির উন্নয়ন ও অব্যবহৃত মরুভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে শুরু হলেও, প্রকল্পটি অপ্রত্যাশিতভাবে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে এবং তৃণভূমির বিকাশ ঘটায়, যা একটি নতুন ‘ফটোভোলটাইক-পশুপালন পরিপূরক’ কাঠামোর অন্বেষণের পথ খুলে দেয়। কাঠামোটি নতুন শক্তির উৎসগুলোর উন্নয়নকে সম্পর্কহীন এবং এমনকি পারস্পরিকভাবে সীমাবদ্ধ অবস্থা থেকে পারস্পরিকভাবে উপকারী ও উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক অবস্থায় রূপান্তরিত করে, যা বিশ্বজুড়ে মরু অঞ্চলের সবুজ রূপান্তরের জন্য একটি উজ্জ্বল চীনা উদাহরণ স্থাপন করে।৩ হাজার মিটারের বেশি গড় উচ্চতার কারণে তা লা সৈকতে প্রচুর সূর্যালোক এবং বিশাল ও অবিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড রয়েছে, যা ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুবিধা প্রদান করে। এই অনন্য প্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে, একটি বড় আকারের ফটোভোলটাইক শিল্প-উদ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। উদ্যানটিতে বিস্তৃত ফটোভোলটাইক প্যানেলগুলো একটি নীল শক্তি ম্যাট্রিক্স তৈরি করেছে, যা ক্রমাগত স্থিতিশীল ও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ করে এই অঞ্চলের নিম্ন-কার্বন রূপান্তরে অবদান রাখছে। প্রাথমিকভাবে, সকলের মূল উদ্দেশ্য ছিল শক্তি উৎপাদন এবং তাঁরা কেবল অনুর্বর গোবি মরুভূমি থেকে সবুজ অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির আশা করেছিলেন। কিন্তু, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পশুপালন শিল্পের সঙ্গে এর গভীর সংযোগের কথা কল্পনাও করেননি।শিল্প উন্নয়নের বিস্ময়কর রূপান্তর শুরু হয়েছিল পরিবেশের নীরব পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে। সারি সারি ফটোভোলটাইক প্যানেল একটি প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে, যা মালভূমির ভূমিকে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করে এবং মাটির আর্দ্রতা বাষ্পীভবন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও প্যানেল থেকে চুইয়ে পড়া জল ক্রমাগত অনুর্বর ভূমিকে পুষ্ট করে। বছরের পর বছর ধরে পরিবেশগত সংরক্ষণ হাজার হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকা মরুভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে, উদ্ভিদের আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে এবং একদা অনুর্বর ভূমিকে সুবিশাল উন্নত মানের তৃণভূমিতে রূপান্তরিত করেছে।পরিবেশগত অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন উন্নয়নমূলক প্রতিবন্ধকতাও দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত বেড়ে ওঠা ঘাস ফটোভোলটাইক কাঠামোর কাজে বাধা সৃষ্টি করে বিদ্যুতের উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং শরৎ ও শীতকালে শুকিয়ে যাওয়া আগাছা অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। প্রচলিত হাতে আগাছা পরিষ্কার করার পদ্ধতিতে প্রচুর জনবল ও সম্পদের প্রয়োজন হয়, যা উদ্যানের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। পাশাপাশি, এটি একটি বিশাল ফটোভোলটাইক পার্কের ব্যবস্থাপনার কাজকেও কঠিনতর করে। একদিকে যেমন নতুন জ্বালানি শিল্পের স্থিতিশীল উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি পুনরুজ্জীবিত তৃণভূমি ও স্থানীয় পশুপালকদের জীবিকা রক্ষারও প্রয়োজন আছে। আপাতদৃষ্টিতে পরস্পরবিরোধী এই দুটি বিষয় একটি জরুরি উন্নয়নমূলক সমস্যায় পরিণত হয়েছে, যার সমাধান করা প্রয়োজন।দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়ে, চীন একক উন্নয়ন মানসিকতা পরিত্যাগ করে। মালভূমি অঞ্চলের বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে, এক অনন্য ‘পশুপালন-সৌর পরিপূরক’ উন্নয়ন-পথ খুঁজে বের করে। এতে সমস্যা সুযোগে রূপান্তরিত হয়। স্থানীয় এলাকাগুলো নবগঠিত তৃণভূমি সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার করে, পশুপালকদের বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যায়ক্রমিক পশুচারণ পরিচালনায় নির্দেশনা দেয় এবং এক স্বতন্ত্র ‘ফটোভোলটাইক ভেড়া’ শিল্প গড়ে তোলে।এই উদ্ভাবনী কাঠামো একাধিক সুবিধা প্রদান করে। ফটোভোলটাইক শিল্পের জন্য ভেড়াগুলো স্বাভাবিকভাবে আগাছা খেয়ে উদ্যানে আগাছা পরিষ্কার করা এবং আগুন প্রতিরোধের মতো কাজগুলো দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করে। এটি উচ্চ শ্রম খরচ ছাড়াই ফটোভোলটাইক যন্ত্রপাতির স্থিতিশীল কার্যক্রম নিশ্চিত করে। গ্রামীণ পশুপালন এলাকায় প্যানেলের নিচের প্রাকৃতিক চারণভূমি গবাদি পশুর উচ্চমানের, বিনামূল্যে প্রাকৃতিক খাদ্য সরবরাহ করে। এটি কৃষকদের পশুপালনের খরচ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয় ও স্থানীয়ভাবে তাদের আয় বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, ভেড়ার বিষ্ঠা জমিতে ফিরে আসে, যা ক্রমাগত মাটির গুণগত মান উন্নত করে, পরিবেশগত পুনরুদ্ধারের ফলাফলকে আরও সুসংহত করে এবং একটি সম্পূর্ণ বদ্ধ চক্র তৈরি করে।বর্তমানে তা লা সৈকত জনশূন্য মরুভূমির রূপ ঝেড়ে ফেলে পরিবেশ, শিল্প ও মানুষের জীবনযাত্রায় এক যুগান্তকারী অগ্রগতি অর্জন করেছে। ফটোভোলটাইক শিল্প উদ্যানটি এখন আর একটি স্রেফ শক্তি উৎপাদনকেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি পরিবেশবান্ধব চারণভূমিতেও পরিণত হয়েছে, যা গ্রামীণ উন্নয়নকে চালিত করে ও পশুপালকদের সমৃদ্ধ করে। এই উদ্ভাবনী কাঠামো পার্শ্ববর্তী ১৮টি গ্রামে সম্মিলিত অর্থনীতির উন্নয়নে ছড়িয়ে পড়েছে ও তাকে চালিত করেছে।তা লা সৈকতের এই অসাধারণ রূপান্তরের মূলে রয়েছে সহাবস্থান ও পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার প্রজ্ঞা। এটি এই প্রচলিত ধারণাটিকে ভেঙে দিয়েছে যে, ‘শিল্প উন্নয়ন অনিবার্যভাবে পরিবেশকে বলি দেয় ও নির্মাণকাজ অনিবার্যভাবে ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে প্রতিস্থাপন করে’। এটি নতুন শক্তি উন্নয়নের জন্য স্থানীয় শিল্পকে পরিত্যাগ করেনি, কিংবা ঐতিহ্যবাহী উন্নয়ন মডেল আঁকড়ে ধরে সবুজ সুযোগও হাতছাড়া করেনি। এটি একটি স্বল্প খরচের, অনুকরণযোগ্য ও টেকসই স্থানীয় সমাধানের মাধ্যমে শক্তি উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের মধ্যে নিখুঁত ভারসাম্য স্থাপন করেছে।ঊষর গোবি মরুভূমি থেকে শক্তির মরূদ্যানে, একক বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে কৃষি ও সৌরশক্তির মধ্যে এক মিথোজীবী সম্পর্কে, তা লা সৈকতের উদ্ভাবনী কার্যক্রম মানবতা ও প্রকৃতির মধ্যে সুরেলা সহাবস্থানের উন্নয়ন দর্শনকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। চীনের গ্রামীণ সবুজ উন্নয়নের অভিজ্ঞতাটি সহজবোধ্য, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর। এটি বিশ্বজুড়ে শুষ্ক ও মরু অঞ্চলে পরিবেশগত শাসন, শক্তির রূপান্তর ও মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি অত্যন্ত মূল্যবান নতুন সমাধান প্রদান করে।সূত্র: ছাই, আলিম, ওয়াং হাইমান, চায়না মিডিয়া গ্রুপ।
অপ্রতিমের রক্তে লেখা প্রশ্ন: আমরা কী ধরনের সমাজ গড়ছি?
শুক্রবারের সেই বিকেলটা হয়তো কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় সাধারণই কেটে যেত। একজন মা তার একমাত্র সন্তানকে আদর করে বিদায় জানাতেন, একজন বাবা হয়তো দোকান থেকে ফিরে ছেলের মুখ দেখার অপেক্ষায় থাকতেন। কিন্তু সেই বিকেলটা আর সাধারণ থাকল না। ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বেরিয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে। তার চোখে ছিল কৌতূহল, মুখে ছিল হাসি, হৃদয়ে ছিল নিষ্পাপ আনন্দ। সে জানত না, সেই ছোট্ট যাত্রাই তার জীবনের শেষ যাত্রা হয়ে যাবে। লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গলে বাঁশের লাঠির নির্মম আঘাতে তার ছোট্ট মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর সেই আইফোনটুকুই হবে তার প্রাণের মূল্য।আজ যখন আমি এই সম্পাদকীয় লিখছি, তখন অপ্রতিমের দেহ ইতিমধ্যেই মাটির নিচে চিরনিদ্রায় শায়িত। দুই দফা জানাজা শেষে কোটবাড়ির বাগমারা গোরস্থানে তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা ড. নাহিদা বেগম-কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক-তিনি আজ শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন শোকাহত মা। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ও কেবল একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি একজন পিতা, যার বুকের ভেতর সবকিছু ভেঙে গেছে। তাদের একমাত্র সন্তান চলে গেছে। যে সন্তানকে নিয়ে তারা স্বপ্ন দেখতেন, যে সন্তানের হাসিতে তাদের ঘর আলো হয়ে উঠত, সেই সন্তান আজ নেই। শুধু একটি আইফোনের লোভে।পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সত্য। শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার সঙ্গে ছিল সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক ফাহাদ ও কামরুল। তারা অপ্রতিমের সহপাঠী ছিল না। অসমবয়সি ‘বন্ধুত্ব’র আড়ালে লুকিয়ে ছিল নির্মম লোভ। আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় যখন অপ্রতিম বাধা দেয়, তখন শুরু হয় ধস্তাধস্তি। প্রথমে তুহিন লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। তারপর ফাহাদ ও কামরুলও একইভাবে আঘাত হানে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তারা আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল ছাড়ে। পরদিন সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে মাকে সান্ত্বনাও দেয়-যেন কিছুই হয়নি। এই নির্লজ্জতা আমাদের সমাজের মুখোশ খুলে দিয়েছে।সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ দ্রুত তুহিনকে আটক করে। জিজ্ঞাসাবাদে সে অপরাধ স্বীকার করে। পরে অন্যদেরও গ্রেফতার করা হয়। আইফোনও উদ্ধার হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রশংসা করেছেন পুলিশের তৎপরতার। শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেছে, ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছে। এসবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু গ্রেফতার আর বিক্ষোভ দিয়ে কি এই ক্ষত সারবে? অপ্রতিমের রক্ত কি শুধু একটি মামলার ফাইলে বন্দি হয়ে থাকবে?এই হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে তিনটি গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে। প্রথম প্রশ্ন-আমাদের কিশোর-তরুণ সমাজ কোথায় যাচ্ছে? তুহিন, ফাহাদ, কামরুল-এরা কেউই অপ্রতিমের সহপাঠী ছিল না। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া বা অনিয়মিত শিক্ষার্থী। তাদের জীবনে শিক্ষার অভাব, মূল্যবোধের শূন্যতা, আর সহজে টাকার লোভ মিলেমিশে এক ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। একটি আইফোনের জন্য একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া-এটা শুধু অপরাধ নয়, মানবতার প্রতি চরম অবমাননা। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ডিগ্রি দিতে ব্যস্ত, নাকি তাদের মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? পরিবারে নৈতিক শিক্ষার অভাব, স্কুলে মূল্যবোধ চর্চার দুর্বলতা, আর সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি-এই ত্রিমুখী ব্যর্থতাই আজ অপ্রতিমের মতো শিশুদের কবর দিচ্ছে।দ্বিতীয় প্রশ্ন-আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল যেন অপরাধীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। একটি শিশু বিকেল বেলা বাসা থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসছে না-এই বাস্তবতা আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির করুণ চিত্র তুলে ধরে। সিসিটিভি থাকলেও, পুলিশ থাকলেও, শিশুরা নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ইউনিট, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর হেল্পলাইন-এসব দাবি এখন আর উপেক্ষা করা যায় না। শিক্ষার্থীরা যে চার দফা দাবি তুলেছে, তা শুধু তাদের দাবি নয়-গোটা জাতির দাবি।তৃতীয় এবং সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন-আমরা কী ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে বেঁচে আছি? একটি আইফোন। এক টুকরো ধাতব যন্ত্র। আর তার বিনিময়ে একটি শিশুর জীবন। এই সমীকরণ কি আমাদের সমাজের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে? আমরা কি এতটাই লোভী হয়ে গেছি যে একটি শিশুর প্রাণের চেয়ে একটি ফোন বেশি মূল্যবান? অপ্রতিমের মা ফেসবুকে ছেলেকে খুঁজে পেতে সাহায্য চেয়েছিলেন। তার সেই আকুতি আজও আমাদের কানে বাজে। কিন্তু আমরা কি শুনেছি? নাকি শুধু খবর পড়ে পরের খবরে চলে গেছি?অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড শুধু কুমিল্লার ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, প্রতিটি গ্রামের সম্ভাব্য বাস্তবতা। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে, হত্যা হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে। আমরা খবর পড়ি, কিছুক্ষণ আলোচনা করি, তারপর ভুলে যাই। কিন্তু অপ্রতিমের মা ভুলতে পারবেন না। তার বুকের ভেতর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিন ভরবে না। বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার যে স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে নিয়ে, সেই স্বপ্ন আজ ছাই হয়ে গেছে। তারা আজ শুধু একটি সন্তান হারাননি-তারা হারিয়েছেন ভবিষ্যতের সব আলো।এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী? প্রথমত, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার। আসামিদের শাস্তি যেন উদাহরণ হয়। কেউ যেন আর ভাবে না যে একটি শিশুর জীবন এত সস্তা। দ্বিতীয়ত, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ। পরিবারে সচেতনতা, স্কুলে নৈতিক শিক্ষা, আর সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ চর্চা-এগুলো অপরিহার্য। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দৃশ্যমান পুলিশ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব। আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো রেজাল্টের পেছনে ছুটতে শেখাচ্ছি, নাকি তাদের মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? আমরা কি লোভকে জয় করার শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি লোভকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে তুলছি?অপ্রতিম চলে গেছে। কিন্তু তার রক্তে লেখা প্রশ্নটি রয়ে গেছে। আমরা কি এই সমাজকে বদলাতে পারব? নাকি আরও অনেক মায়ের কান্না শুনতে শুনতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠব? উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। আজই। কাল হলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। কারণ অপ্রতিমের মতো আরও অনেক শিশু আজও বাইরে খেলছে, ছবি তুলছে, স্বপ্ন দেখছে। তাদের নিরাপত্তা আমাদের দায়িত্ব। তাদের হাসি আমাদের সম্পদ। আর তাদের জীবন-কোনো আইফোনের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।আমরা যদি আজ নীরব থাকি, যদি শুধু খবর পড়েই ক্ষান্ত দিই, তবে অপ্রতিমের রক্ত বৃথা যাবে। কিন্তু আমরা যদি জেগে উঠি, যদি পরিবর্তনের শপথ নিই, তবে তার ছোট্ট জীবন হয়তো অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা করবে। মা নাহিদা বেগম আজ হয়তো শুধু কান্নাই করতে পারেন। বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার হয়তো শুধু নীরব যন্ত্রণাই বহন করতে পারেন। কিন্তু আমরা-সমাজের মানুষরা-পারি আরও কিছু। আমরা পারি প্রতিজ্ঞা করতে যে আর কোনো অপ্রতিম যেন এভাবে না হারায়। আর কোনো মা যেন এভাবে না কাঁদে। আর কোনো আইফোন যেন আর কোনো শিশুর প্রাণের মূল্য না হয়।আমার লেখা এই সম্পাদকীয় শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়। এটি একটি আহ্বান। একটি শপথ। একটি প্রতিজ্ঞা। অপ্রতিমের স্মৃতিকে আমরা যদি শুধু কান্নায় সীমাবদ্ধ রাখি, তবে আমরা ব্যর্থ। কিন্তু যদি তার রক্তকে পরিবর্তনের শক্তি বানাই, তবে হয়তো একদিন আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারব যেখানে একটি শিশুর হাসি কোনো লোভের শিকার হবে না। যেখানে একটি মায়ের আইফোন কোনো হত্যার কারণ হবে না। যেখানে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল আর কোনো শিশুর কবরস্থান হবে না।অপ্রতিম, তুমি চলে গেছ। কিন্তু তোমার প্রশ্নটি রয়ে গেছে। আমরা উত্তর দেব-আজই।লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক।
চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে প্রশ্নপত্রে ভুলের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন বলেছেন, প্রশ্ন আমরা তৈরি করিনি, বিগত সরকার করেছে। আপনি কি তাই মনে করেন?
ব্রাহ্মণপাড়ায় ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মিশন গ্রেফতার
বিএনপি নেতা রাজেশের প্রত্যক্ষ মদদে সন্ত্রাসী মহড়া • মামলা সত্ত্বেও নীরব প্রশাসন / পুলিশের সামনেই সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকির মুখে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা
অপরাধ অনুসন্ধান পত্রিকা’র উদ্যোগে জাঁকজমকপূর্ণ ফল উৎসব অনুষ্ঠিত
প্রশিক্ষণ শেষে ৩০ প্রান্তিক পেশাজীবীর হাতে ১৮ হাজার টাকা করে অনুদান, মিলল সনদও