ঢাকা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন গোটা জাতি এক চরম অনিশ্চয়তায় নিপতিত হয়েছিল। সেই ঘোর অমানিশার মাঝে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অকুতোভয় সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
★ বিদ্রোহের দাবানল: চট্টগ্রামের সেই ঐতিহাসিক রাত ★
২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনে মত্ত, তখন চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। দেশপ্রেমের টানে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি বীরদর্পে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার সেই তেজোদীপ্ত উচ্চারণ— "We revolt" (আমরা বিদ্রোহ করলাম)—ছিল দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সুসংবদ্ধ সামরিক প্রতিরোধের সূচনা। এই সাহসী পদক্ষেপটি সেই সময়ের স্তম্ভিত বাঙালি সেনাদের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিল।
★ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও স্বাধীনতার ঘোষণা ★
মেজর জিয়াউর রহমানের বীরত্বগাথার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হলো কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। ২৭শে মার্চ, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে তিনি প্রথমে নিজের নামে এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই ঘোষণাটি সেই সন্ধিক্ষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। একজন সশরীরে যুদ্ধরত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে সাধারণ মানুষ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা সুসংগঠিত হওয়ার প্রেরণা পান। এটি আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের জোরালো বার্তা পৌঁছে দেয়।
★ রণক্ষেত্রের সেনানী: সেক্টর কমান্ড ও ‘জেড ফোর্স’ ★
জিয়াউর রহমান কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সরাসরি রণক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সেক্টর কমান্ডার: মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অধীনে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জেড ফোর্স গঠন: যুদ্ধের গতি বৃদ্ধির লক্ষে জুলাই মাসে তার নেতৃত্বে প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়। তার দক্ষ রণকৌশলে রৌমারী, বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ধামাই চা বাগানের যুদ্ধসহ বেশ কিছু সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়।
★ বীরত্বের স্বীকৃতি ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য ★
স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে তৎকালীন সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২৫শে মার্চের ভয়াবহতার পর তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল দিশেহারা জাতির জন্য এক বিশাল নৈতিক শক্তি।
ইতিহাসের দর্পণে:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাকাব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অকুতোভয় বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। তার সেই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ রণাঙ্গনের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ জনতাকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ডের স্বপ্নে ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের শিলালিপিতে তিনি অমর হয়ে থাকবেন একজন কালজয়ী বীর হিসেবে।
তথ্যসূত্র: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত এবং হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র' (তৃতীয় ও নবম খণ্ড)।
লেখক : শাহিন আলম আশিক
সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক মুক্তির লড়াই।

বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ মার্চ ২০২৬
ঢাকা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ইতিহাসের জঘন্যতম বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে, তখন গোটা জাতি এক চরম অনিশ্চয়তায় নিপতিত হয়েছিল। সেই ঘোর অমানিশার মাঝে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অকুতোভয় সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
★ বিদ্রোহের দাবানল: চট্টগ্রামের সেই ঐতিহাসিক রাত ★
২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনে মত্ত, তখন চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। দেশপ্রেমের টানে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি বীরদর্পে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার সেই তেজোদীপ্ত উচ্চারণ— "We revolt" (আমরা বিদ্রোহ করলাম)—ছিল দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সুসংবদ্ধ সামরিক প্রতিরোধের সূচনা। এই সাহসী পদক্ষেপটি সেই সময়ের স্তম্ভিত বাঙালি সেনাদের মনে সাহসের সঞ্চার করেছিল।
★ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র ও স্বাধীনতার ঘোষণা ★
মেজর জিয়াউর রহমানের বীরত্বগাথার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হলো কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ। ২৭শে মার্চ, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে তিনি প্রথমে নিজের নামে এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই ঘোষণাটি সেই সন্ধিক্ষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। একজন সশরীরে যুদ্ধরত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে সাধারণ মানুষ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা সুসংগঠিত হওয়ার প্রেরণা পান। এটি আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনের জোরালো বার্তা পৌঁছে দেয়।
★ রণক্ষেত্রের সেনানী: সেক্টর কমান্ড ও ‘জেড ফোর্স’ ★
জিয়াউর রহমান কেবল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সরাসরি রণক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সেক্টর কমান্ডার: মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের অধীনে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের (চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জেড ফোর্স গঠন: যুদ্ধের গতি বৃদ্ধির লক্ষে জুলাই মাসে তার নেতৃত্বে প্রথম নিয়মিত সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’ গঠিত হয়। তার দক্ষ রণকৌশলে রৌমারী, বাহাদুরাবাদ ঘাট ও ধামাই চা বাগানের যুদ্ধসহ বেশ কিছু সম্মুখ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়।
★ বীরত্বের স্বীকৃতি ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য ★
স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে তৎকালীন সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। ২৫শে মার্চের ভয়াবহতার পর তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল দিশেহারা জাতির জন্য এক বিশাল নৈতিক শক্তি।
ইতিহাসের দর্পণে:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহাকাব্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অকুতোভয় বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল প্রতিরোধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। তার সেই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ রণাঙ্গনের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারণ জনতাকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ডের স্বপ্নে ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ করেছিল। ইতিহাসের শিলালিপিতে তিনি অমর হয়ে থাকবেন একজন কালজয়ী বীর হিসেবে।
তথ্যসূত্র: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত এবং হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র' (তৃতীয় ও নবম খণ্ড)।
লেখক : শাহিন আলম আশিক
সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক মুক্তির লড়াই।

আপনার মতামত লিখুন