মুক্তির লড়াই

শিক্ষাঙ্গন

একই কর্মস্থলে বারবার পদায়ন আব্দুল মান্নানের

ঘুষ-নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদে বিতর্কিত বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা

ঘুষ-নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদে বিতর্কিত বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ গ্রহণ, শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য, এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম, শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিদ্যালয় পরিদর্শনের নামে অর্থ আদায়, একই কর্মস্থলে বারবার পদায়ন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ক্ষোভ বিরাজ করছে শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলে।

অভিযোগ রয়েছে, একজন উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা হয়েও তিনি কুমিল্লা নগরীর ঠাকুরপাড়ায় তিনটি ফ্ল্যাট ও দুটি প্লটের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বুড়িচংয়ে দায়িত্ব পালনের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও একই উপজেলায় ফিরে আসেন তিনি। পরে ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল পুনরায় বুড়িচংয়ে যোগদান করেন। একই কর্মস্থলে বারবার পদায়নের নেপথ্যে কী কারণ—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয়দের মধ্যে।


অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালে বুড়িচং কালীনারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিজের স্ত্রী খন্দকার উম্মে সালমাকে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা পদে নিয়োগে প্রভাব খাটান আব্দুল মান্নান। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতা ও কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও প্রভাব বিস্তার করে নিয়োগ এবং পরবর্তীতে এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা করা হয়।

জামাল মামুন নামে এক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষকতার চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম অর্থ নেওয়া হলেও চাকরি দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদনের জন্য গেলে আব্দুল মান্নান বলেন, “বিএনপির কারও নাম নিয়ে আমার কাছে আসবেন না।” পরে অন্য একজনের নাম প্রস্তাব করার পর অনুমোদন দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

আরেকজন প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে কর্মকর্তা বিদায়ের সময় ‘খাম’ বা ‘তেল খরচ’ বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকা প্রত্যাশা করেন। টাকা দিতে দেরি হলে বিভিন্ন অজুহাতে বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে হয়রানি করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

বুড়িচং উপজেলার এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, “দায়িত্ব পালনকালে আব্দুল মান্নানের বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এখন আবার একই উপজেলায় ফিরে আসায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অনেকেই বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ করছে। সব অভিযোগ সঠিক নয়। আমার চাকরি আর বেশি দিন নেই।” তিনি আরও বলেন জামাল মামুন নামে কাউকে আমি চিনি। এই সমস্ত অভিযোগ হল কাল্পনিক ভিত্তিহীন। নিয়োগের বিষয় হল বিদ্যালের ম্যানেজিং কমিটির লোকজনের। আমি সরকারি চাকুরী করি আমাদের একটা বাইন্ডিং রয়েছে এর বাহিরে যাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


শিক্ষক ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলো যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচিত, তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি। তারা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে দুদক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আপনার মতামত লিখুন

মুক্তির লড়াই

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


ঘুষ-নিয়োগ বাণিজ্য ও অবৈধ সম্পদে বিতর্কিত বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ গ্রহণ, শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য, এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম, শিক্ষকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিদ্যালয় পরিদর্শনের নামে অর্থ আদায়, একই কর্মস্থলে বারবার পদায়ন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ক্ষোভ বিরাজ করছে শিক্ষক সমাজ, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলে।

অভিযোগ রয়েছে, একজন উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা হয়েও তিনি কুমিল্লা নগরীর ঠাকুরপাড়ায় তিনটি ফ্ল্যাট ও দুটি প্লটের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বুড়িচংয়ে দায়িত্ব পালনের পর অল্প সময়ের ব্যবধানে আবারও একই উপজেলায় ফিরে আসেন তিনি। পরে ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল পুনরায় বুড়িচংয়ে যোগদান করেন। একই কর্মস্থলে বারবার পদায়নের নেপথ্যে কী কারণ—তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয়দের মধ্যে।


অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালে বুড়িচং কালীনারায়ণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিজের স্ত্রী খন্দকার উম্মে সালমাকে সহকারী প্রধান শিক্ষিকা পদে নিয়োগে প্রভাব খাটান আব্দুল মান্নান। অভিযোগকারীদের দাবি, যোগ্যতা ও কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও প্রভাব বিস্তার করে নিয়োগ এবং পরবর্তীতে এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা করা হয়।

জামাল মামুন নামে এক শিক্ষক অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষকতার চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম অর্থ নেওয়া হলেও চাকরি দেওয়া হয়নি এবং অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, ২০২২ সালে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অনুমোদনের জন্য গেলে আব্দুল মান্নান বলেন, “বিএনপির কারও নাম নিয়ে আমার কাছে আসবেন না।” পরে অন্য একজনের নাম প্রস্তাব করার পর অনুমোদন দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।

আরেকজন প্রধান শিক্ষক অভিযোগ করেন, বিদ্যালয় পরিদর্শনে এসে কর্মকর্তা বিদায়ের সময় ‘খাম’ বা ‘তেল খরচ’ বাবদ প্রায় ৫ হাজার টাকা প্রত্যাশা করেন। টাকা দিতে দেরি হলে বিভিন্ন অজুহাতে বিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলে হয়রানি করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

বুড়িচং উপজেলার এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন, “দায়িত্ব পালনকালে আব্দুল মান্নানের বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়ে এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এখন আবার একই উপজেলায় ফিরে আসায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অনেকেই বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ করছে। সব অভিযোগ সঠিক নয়। আমার চাকরি আর বেশি দিন নেই।” তিনি আরও বলেন জামাল মামুন নামে কাউকে আমি চিনি। এই সমস্ত অভিযোগ হল কাল্পনিক ভিত্তিহীন। নিয়োগের বিষয় হল বিদ্যালের ম্যানেজিং কমিটির লোকজনের। আমি সরকারি চাকুরী করি আমাদের একটা বাইন্ডিং রয়েছে এর বাহিরে যাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


শিক্ষক ও সচেতন মহলের দাবি, অভিযোগগুলো যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে আলোচিত, তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি। তারা বলছেন, শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে দুদক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের যৌথ তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।


মুক্তির লড়াই

সম্পাদক ও প্রকাশক: কামরুজ্জামান জনি
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত মুক্তির লড়াই